Trending

ইসলামে পবিত্র হজ ও উমরার বিধান

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি

জুমার খুতবা

০২ জিলকদ|১৪৪৩ হিজরি|শুক্রবার|৩ জুন, ২০২২ 

ইসলামে হজ্ব ও উমরার বিধান

হে মানব মন্ডলী! 

আল্লাহ তা’য়ালাকে ভয় করুন, জেনে রাখুন পবিত্র ক্বাবা ঘর ভূপৃষ্ঠের উপর নির্মিত প্রথম ঘর। সমগ্র মানব জাতির ঈমান ও হিদায়তের কেন্দ্রস্থল। অন্ধকার থেকে আলোর পথের নির্দেশিকা।

হজ্ব ও কা’বা শরীফ:

হজ্ব ইসলামের পঞ্চ রুকনের একটি অন্যতম রুকন। আর্থিক ও শারীরিক দিক থেকে সামর্থবানদের উপর জীবনে একবার হজ্ব করা ফরজ। হজ্ব অর্থ ইচ্ছা বা সঙ্কল্প করা। শরীয়তের পরিভাষায় আল্লাহ ও রসূলের সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে শরীয়তের বিধান অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট স্থান তথা বায়তুল্লাহ শরীফ ও সংশ্লিষ্ট স্থানসমূহ যিয়ারত করার সংকল্প করাকে হজ্ব বলা হয়। ( ফতোয়ায়ে শামী, ২য় খন্ড)

হজ্ব একটি ফরজ ইবাদত কোরআনে এরশাদ হয়েছে, “মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ আছে আল্লাহর উদ্দেশ্য সে ঘরের হজ্ব করা তার উপর ফরজ এবং কেউ প্রত্যাখান করলে সে জেনে রাখুক আল্লাহ বিশ্ব জগতের মুখাপেক্ষী নন। (৩:৯৭)

অপর এক আয়াতে হজ্বের নির্দেশ ইরশাদ হয়েছে, এবং সাধারণভাবে মানবকুলের মধ্যে ঘোষণা করে দিন যেন তারা এ বায়তুল্লাহ হজ্ব করার জন্য পদব্রজে ও হাল্কা পাতলা উটের উপর আরোহণ করে দূরদূরান্তের দুরত্ব অতিক্রম করে আসে। এ বরকতমন্ডিত ভূখন্ডে অবস্থিত কা’বা গৃহই পৃথিবীর সর্বপ্রথম নির্মিত ঘর। সর্বপ্রথম মসজিদ মসজিদুল হারাম। “মানব জাতির জন্য সর্বপ্রথম যে ঘর নির্মিত হয়েছিল তা মক্কায় যা বরকতময়, বিশ্বজগতের দিশারী। (৩:৯৬)

কা’বা ঘরের নির্মাণ ও সংস্কার:

হযরত আদম আলাইহিস্‌ সালাম থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত কা’বা শরীফ অনেকবার পুন:নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। পুন:নির্মাণ ও সংস্কার কর্মের একটি কালানুক্রমিক তালিকা নিম্নরূপ:

১। হযরত আদম আলাইহিস সালাম প্রথম নির্মাণকারী,

২। হযরত শীস আলাইহিস্‌ সালাম,

৩। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালাম,

৪। আমালিকা গোত্র,

৫। জুরহুম গোত্র,

৬। মুদার গোত্র,

৭। কোরায়েশ গোত্র,

৮। হযরত আবদুল্লাহ বিন জুবাইর রদিয়াল্লাহু আনহু,

৯। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ,

১০। উসমানী সুলতান মুরাদ ইবনে আহমদ,

১১। সাউদী বাদশা কর্তৃক সংস্কার ও সম্প্রসারণ। (সূত্র: আব্বাস কারারা: আদদ্বীন ওয়া তারীখুল হারামাঈন আশশারীফাঈন, ৪র্থ সংস্করণ ১৩৮৭/১৯৬৮)

হজ্ব ফরজ হওয়ার শর্তাবলীঃ

১। মুসলমান হওয়া,

২। জ্ঞানবান হওয়া,

৩। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া,

৪। স্বাধীন হওয়া,

৫। আর্থিকভাবে সক্ষম হওয়া,

৬। হজ্ব ফরজ হওয়ার ইলম থাকা,

৭। হজ্বের সময় হওয়া। (শামী, ২য় খন্ড)

হজ্ব ওয়াজিব হওয়ার শর্তাবলী:

১। শারীরিক সুস্থতা,

২। রাস্তাঘাট নিরাপদ হওয়া,

৩। কারাবন্দি না হওয়া,

৪। মহিলাদের সঙ্গে স্বামী অথবা মুহরিম (যাদের বিয়ে করা হারাম) ব্যক্তি সঙ্গে থাকা,

৫। মহিলাদের ইদ্দত পালনের অবস্থা হতে মুক্ত হওয়া,

হজ্বের ফরজ:

১। হজ্বের নিয়তে ইহরাম পরিধান করা,

২। আরাফাত ময়দানে অবস্থান করা। অর্থাৎ ৯ যিলহজ্ব সূর্য হেলে যাওয়ার পর থেকে ১০ যিলহজ্ব সুবহি সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত যে কোন সময় এক মুহূর্তের জন্য হলেও আরাফাত ময়দানে অবস্থান করা।,

৩। তাওয়াফে যিয়ারত বা ফরজ তাওয়াফ করা। ১০ যিলহজ্ব কোরবানী করার পর হতে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত যেকোন সময় এ তাওয়াফ করা যায়। (বি:দ্র: এ ফরজ তিনটির কোন একটিও বাদ পড়লে হজ্ব সহীহ হবে না। দম বা কোরবানী দ্বারাও এর ক্ষতিপূরণ আদায় হবে না।)

হজ্বের ওয়াজিব ৬টি:

১। সাফা–মারওয়া সায়ী করা,

২। ৯ যিলহজ্ব দিবাগত রাত্রে মুযদালিফায় অবস্থান করা,

 ৩। জমরায় কঙ্কর নিক্ষেপ (রমী) করা,

 ৪। কোরবানী করা,

 ৫। মাথার চুল মুন্ডানো অথবা ছাটানো,

 ৬। তাওয়াফে বিদা বা বিদায়ী তাওয়াফ করা।

হজ্বের প্রকারভেদ:

হজ্ব তিন প্রকার। যথা:-

১. ইফরাদ,

২. ক্বিরান,

৩. তামাত্তু।

হজ্বে ইফরাদ: মীকাত থেকে কেবলমাত্র হজ্বের ইহরাম পরিধান করাকে ইফরাদ বলা হয়।

হজ্বে ক্বিরান: মীকাত থেকে একই সাথে হজ্ব ও উমরার নিয়্যতে ইহরাম পরিধান করাকে ক্বিরান বলে।

হজ্বে তামাত্তু: মীকাত থেকে প্রথমে উমরার নিয়্যতে ইহরাম বেঁধে মক্কা শরীফে উমরা সম্পাদন করে ইহরাম খুলে ফেলবেন। পরে ৮ যিলহজ্ব মিনায় যাওয়ার আগে হজ্বের নিয়্যতে পুন: ইহরাম পরিধান করবেন। বাংলাদেশী হাজ্বীরা এ প্রকারের হজ্ব করে থাকেন।

ইহরাম:

ইহরাম অর্থ হারাম বা নিষিদ্ধ করা। হজ্ব ও উমরা পালনেচ্ছু ব্যক্তিগণ যখন ইহরাম বেঁধে হজ্ব অথবা উমরা পালন করার দৃঢ় নিয়্যতে তালবিয়া পাঠ করেন তখন তাদের উপর কতিপয় হালাল এবং মুবাহ কাজও ইহরাম পরিধানের কারণে হারাম হয়ে যায়। এ কারণেই একে ইহরাম বলা হয়।

ইহরামের পূর্বে করণীয়:

ইহরামের পূর্বে হাত ও পায়ের নখ কাটবেন, গোঁফ ছোট করে নেবেন। বগল ও নাভীর নীচের পশম মুন্ডন করবেন।

ইহরামের কাপড় পরিধান:

ইহরাম পরিধান ব্যতীত হজ্ব ও উমরা আদায় করা যাবে না। বাংলাদেশী হাজ্বীগণ চট্টগ্রাম বা ঢাকা বিমান বন্দরেই ইহরাম পরিধান করে থাকেন। ইহরামের পূর্বে উত্তমরূপে গোসল করা সুন্নাত। পূরুষগণ সেলাইবিহীন একখানা চাদর পরিধান করবে এবং একখানা চাদর গায়ে জড়াবে। কাপড় সাদা হওয়া মুস্তাহাব এবং নতুন হওয়া ভাল। মহিলাগণ সেলাই করা কাপড় পরিধান করবেন। হাতে–পায়ে মোজা ও মাথায় রুমাল বাঁধবেন। মুখমন্ডল খোলা রাখতে হবে।

ইহরাম অবস্থায় যা নিষিদ্ধ:

১। পুরুষগণ মাথা, মুখ, হাত ও পা ঢেকে রাখা,

২। মহিলাগণ মুখ ঢেকে রাখা,

৩। স্ত্রী সহবাস বা কামোদ্দীপনার সাথে স্পর্শ করা,

৪। সাবান দ্বারা মাথা, চুল, দাঁড়ি ধৌত করা,

 ৫। সুগন্ধি ব্যবহার করা, নখ, চুল কাটা, শরীরের পশম কাটা বা মুন্ডানো,

৬। চুল ও দাঁড়িতে হেজাব লাগানো,

৭। ঝগড়া–বিবাদ, অশ্লীলতা, মিথ্যাচার, গীবত ও গালমন্দ করা,

৮। কোন প্রাণী শিকার করা বা শিকারীকে সহযোগিতা করা, ৯। কোন প্রকার গাছপালা কর্তন করা।

উমরার বিধান:

শরীয়তের পরিভাষায় বিশেষ নিয়মে তথা ইহরাম সহ কাবা ঘরের তাওয়াফ এবং সাফা–মারওয়া সাঈ করাকে উমরা বলে। যিলহজ্ব মাসের ৯ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত এই পাঁচ দিন ব্যতীত বছরের যেকোন সময় উমরা আদায় করা যায়। উমরার ফরজ দু’টি: ১. ইহরাম ও ২. তাওয়াফ। ইহরামের জন্য দু’টি কাজ ফরজ। নিয়ত করা ও তালবিয়া পাঠ করা। উমরার ওয়াজিব দু’টি: ১.সাফাও মারওয়ার মাঝে সাঈ করা, ২. মাথার চুল মুন্ডানো কিংবা ছোট করা অপরিহার্য। উমরা করতে হলে ইহরাম থাকতে হয়। ইহরাম অবস্থায় হাজরে আসওয়াদে চুম্বন করবে, বেশী ভীড় হলে খয়েরী রং এর লম্বা দাগ বরাবর বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে হাতের ইশারায় চুম্বন করতে হয়। হাজরে আসওয়াদকে চুম্বন করে রমল ও ইদতিবাহ’সহ তাওয়াফের দু’আ সমূহ পড়তে পড়তে তাওয়াফ করবেন। যা পূর্বে বর্ণিত রয়েছে। ৭ চক্কর দেয়ার পর মক্কামে ইব্রাহীমে ২ রাকাত ওয়াজিবুত তাওয়াফ নামায পড়তে হয়। তারপর জমজ৫ম কূপের পানি পান করে সাফা মারওয়া ও পাহড়ের মধ্যভাগে ৭ চক্কর দিতে হয় তারপর মাথা মুন্ডাতে হবে এবং হেরেম শরীফের যে কোন স্থানে দু’রাকাত নফল নামায আদায় করে দু’আ মুনাজাত করবেন। এর নাম ওমরা। তাওয়াফ করার সময় নিয়্যতে উমরার নিয়্যতও জরুরী ও অপরিহার্য। স্থানীয় লোক অথবা বাইয়ের লোক মক্কায় অবস্থানকালীন যদি একাধিকবার উমরা করতে চায় প্রত্যেকটি উমরার জন্য মসজিদ থেকে ইহরাম বেঁধে এসে বায়তুল্লাহ শরীফের চতুর্দিকে ৭ চক্কর দেয়া ও পরে মক্বামে ইবরাহীমে ২ রাকাত ওাজিবুত তাওয়াফ নামায পড়ার পর সাফা–মারওয়া পাহাড়ের মধ্যভাগে ৭ চক্কর দিয়ে মাথা মুন্ডানোর পর উমরার কাজ সম্পন্ন করতে হয়।

উমরার নিয়্যত:

“আল্লাহুম্মা ইন্নী উরীদুল উমরাতা ফায়াস সিরহা লী ওয়া তাকাব্বালহা মিন্নী।” বদলী উমরা করলে আরবী নিয়্যতে মিন্নি শব্দের পরিবর্তে মিন জানেব বলে ব্যক্তির নাম উল্লেখ করতে হবে। সাফা পাহাড় থেকে মারওয়া পাহাড় পর্যন্ত একবার যাতায়াতে ১ সায়ী হয়। সুতরাং সাফা পাহাড় থেকে সায়ী আরম্ভ করলে ৭টি সায়ীতে মারওয়া পাহাড়ে শেষ হয়। শুধু নফল তাওয়াফের পর সায়ী নাই। কিন্তু উমরায় তাওয়াফের সায়ী করতে হবে। মক্কায় অবস্থানকালীন হজ্বের ৫দিন ব্যতীত সুবিধামত সময়ে যত খুশী উমরা করা যায়। এই ক্ষেত্রে প্রতিটি উমরার জন্য প্রতিবার নিয়্যত করতে হয়।

ক্বাবা শরীফে দৈনিক একশত বিশটি রহমত অবতীর্ণ হয়:

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, পবিত্র খানায়ে ক্বাবা শরীফে দৈনিক একশত বিশটি রহমত নাযিল হয়। তাওয়াফকারীদের জন্য ৬০ টি, সেখানে নামায আদায়কারীদের জন্য ৪০টি, ক্বাবা শরীফ দর্শনার্থীদের জন্য ২০টি রহমত নাযিল হয়। (বায়হাকী শরীফ, পৃ: ১০৫)

মক্কা শরীফে এক রাকাত নামাযে একলক্ষ রাকাতের সওয়াব:

হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আমার মসজিদে (মসজিদে নববী শরীফ) এক রাকাতে পঞ্চাশ হাজার রাকাতের সওয়াব। মক্কা শরীফের মসজিদুল হারামে এক রাকাতে এক লক্ষ রাকাতের সওয়াবের সমান। (ইবনে মাযাহ শরীফ, খন্ড ১, পৃ: ১০২)

   হে আল্লাহ আমাদেরকে বায়তুল্লাহ শরীফ ও রওজা শরীফের যিয়ারত নসীব করুন। আমীন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা–এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম; খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

Related Articles

Back to top button