জুমার খুতবা- মি’রাজ: রহস্যঘেরা এক বিস্ময়কর মু’জেযা

সৈয়দ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন আল আযহারী

জুমার খুতবা

৪র্থ জুমা, রজব, ১৪৪২ হিজরি

 

 

এই বিশ্বের প্রতিটি রন্দ্রে রন্দ্রে যতো অমীমাংসিত রহস্য আর অলৌকিক ঘটনাবলি সুপ্ত রয়েছে, তার অন্যতম হলো সাইয়্যেদুল মুরসালিন রহমাতাল্লিল আলামিন হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মিরাজ তথা ঊর্ধ্বারোহণ। এই মিরাজের রাতই ছিলো স্রষ্টা ও তাঁর প্রিয় সৃষ্টির কাছে আসার স্মৃতি, এই রাতই ছিল আসমান ও জমিনের শত আলোকবর্ষ দূরত্বকে একাকার করার অভূতপূর্ব মুহুর্ত।

মেরাজ অর্থ ঊর্ধ্বগমন। পরিভাষায় মেরাজ হলো, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক সশরীরে, সজ্ঞানে ও জাগ্রত অবস্থায় হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালামের সাথে বিশেষ বাহন বোরাকের মাধ্যমে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা হয়ে প্রথম আসমান থেকে একে একে সপ্তম আসমান এবং সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত এবং উর্ধ্বজগতের অন্যান্য বড় বড় নিদর্শন দর্শনের উদ্দেশ্যে সেখান থেকে একাকী রফরফ বাহনে আরশে আযীম পর্যন্ত ভ্রমণ; মহান রাব্বুল আলামিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ ও জান্নাত-জাহান্নাম পরিদর্শন করে ফিরে আসা। মাসজিদে হারাম থেকে মাসজিদে আকসা পর্যন্ত ভ্রমণকে ‘ইসরা’ এবং সেখান থেকে ঊর্ধ্বে গমনকে মি’রাজ বলা হয়।

মহান আল্লাহ তা’লা তাঁর প্রিয় হাবীবকে যত মু’জিযা দান করেছেন সেগুলির মধ্যে অন্যতম রহস্যময় বিস্ময়কর মু’জেযা হলো ইসরা ও মি’রাজ। এজন্যই মে’রাজের আয়াতের শুরুতেই আল্লাহ পাক ‘সুবহানা’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যা কেবল অত্যাশ্চর্য্য ঘটনার ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মে’রাজ মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র জীবনের শ্রেষ্ঠ মু’জিযা।

ইসরা ও মি’রাজ ছিল আল্লাহ তা’আলার বিশেষ কুদরত, অলৌকিক নিদর্শন, নবুয়তের সত্যতার স্বপক্ষে এক বিরাট আলামত, জ্ঞানীদের জন্য উপদেশ, মোমিনদের জন্য প্রমাণ, হেদায়েত, নেয়ামত, রহমত, মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্যে হাযির হওয়া, ঊর্ধ্বলোক সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন, অদৃশ্য ভাগ্য সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান লাভ, ইহকাল ও পরকাল সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন, স্বচক্ষে জান্নাত-জাহান্নাম অবলোকন, পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের সাথে সাক্ষাত ও পরিচিত হওয়া, সুবিশাল নভোম-ল পরিভ্রমণ করা, এবং সর্বোপরি এটিকে একটি অনন্য মু‘জিযা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা।

মিরাজ ইসলামের ইতিহাসে এমনকি পুরা নবুওয়াতের ইতিহাসেও অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় ও অবিস্মরণীয় ঘটনা। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম ছাড়া অন্য কোন নবী এই পরম সৌভাগ্য লাভ করতে পারেননি। আর এ কারণেই হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্ব শ্রেষ্ঠ নবী।

মূলত পৃথিবীর ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি সকল চমৎকার ও অলৌকিক ঘটনাবলির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ এই ঘটনাকে নিরঙ্কুশ নির্মোহচিত্তে বিশ্বাস করার নামই ইসলাম। আর যারা বিশ্বাস করেন তাঁরাই সিদ্দিক তথা সত্যান্বেষী ও বিশ্বাসী।

মেরাজ ও বিজ্ঞান:

প্রত্যেক নবী-রাসূল ঐ ধরণের মুজিযা নিয়েই আগমন করেন যা তাঁর জাতির কাছে প্রসিদ্ধ ও পরিচিত এবং যুগের চাহিদা অনুযায়ী ছিল। যাতে চ্যালেঞ্জটা হৃদয় স্পর্শ করে এবং তার কার্যকারিতা নিশ্চিত হয়। মিসরীয়রা যাদু বিদ্যায় বুৎপত্তি অর্জন করেছিল এবং ফিরাউনী মন্দিরের পৌরহিতগণ ছিলো এ বিষয়ে বিশেষ দক্ষ, তারা যাদুর সাহায্য নিতো যাতে মানুষকে হতবুদ্ধি করা যায়, ফিরাউন এবং কাল্পনীক প্রভূদের দাস বানানো যায়। যাদের আরাধনা করত ঐসব পৌরহিত অথবা যাদুকরগণ এবং ওদের নামে জনগণ থেকে নজরানা ও সম্পদ লুন্ঠন করতো।
এ জন্য আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা আলাইহিস সালামকে ঐ ধরনের মুজিযা দিয়ে প্রেরণ করেছেন যা ঐ সব যাদুকরদের কাছে পরিচিত যাতে তাদের যাদু ধ্বংস হয় এবং আল্লাহর সৃষ্টি ও মানুষের সৃষ্টির মধ্যে পার্থক্য হয়।

এমনিভাবে হযরত ঈসা আলাইসি সালামকে প্রেরণ করলেন এমন জাতির নিকট যারা চিকিৎসা বিদ্যায় ছিল পারদর্শি। তারা এমন অভূতপূর্ব পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতো যে মানুষের চক্ষুতে ধাঁধা লেগে যেত। যুক্তিযুক্ত ছিল যে, ঈসা আলাইহিস সালাম যে মুজিযা নিয়ে প্রেরিত হবেন তা এ ক্ষেত্রে আরো অলৌকিক হবে যাতে প্রথমে চিকিৎসকদের নিকট এবং তাদের মাধ্যমে সাধারণের নিকট পরিস্কার হয় যে, এ মুজিযা তারা যা করছে তার চেয়ে উন্নত কোন বস্তু। যে বস্তু তাদের অপারগ করে দেয় এ বিষয় তাদের পারদর্শিতার পরও। অতএব এর জন্য প্রয়োজন ছিল এমন উৎস থেকে সে বস্তুটি আগমন হওয়া যা মানবীয় গন্ডির বাহিরে। অর্থাৎ সরাসরি আল্লাহর পক্ষ হতে।
এ জন্য দেখা যায় তাঁর মুজিযা ছিল কুষ্ঠ ও অন্ধরোগীকে মূহুর্তে তাদের সামনে বিনা ঔষধ ও চিকিৎসায় সুস্থ করে দেয়া। এটা ছিল মানব সাধ্যাতীত। এর পর তার মুজিযার পরিধি আরো বৃদ্ধি হলো মৃতকে জীবিত করা। তারা তো কোন না কোনো মাধ্যম করে কুষ্ঠ ও অন্ধ রোগীর চিকিৎসা করতো। কিন্তু মৃতকে জীবিত করা তাদের সাধ্যের বাইরে ছিল। এটা আল্লাহ অথবা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত কোন মানুষের মুজিযা দ্বারা সম্ভব ছিল।

আল্লাহর প্রিয় রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণ করেছেন আরব জাতির নিকট, আর তারা ছিল সুভাষী ও ভাষা সাহিত্যে অপ্রতিদ্বন্ধী। ভাষা নিয়ে হতো প্রতিযোগীতা, করতো অহংকার, এমনকি তারা অন্যদের আজমী বলে আখ্যা দিতো। অর্থাৎ যাদের ভাষা অস্পষ্ট তারা ঐ ব্যক্তির সাথে তুল্য যে কথা বলতে পারেনা। এজন্য যুক্তি যুক্ত ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুজিযা হবে ভাষা সাহিত্যে মুজিযা। ঐ মানের যে মানে তারা বুৎপত্তি অর্জন করেছিল। যাতে তারা অনুমান করতে পারে যে এটা মানব শক্তি সামর্থের উর্দ্ধে এবং মেনে নেয় যে, এটা অবশ্যই আল্লাহ প্রদত্ত।

উল্লেখ্য যে, পূর্ববর্তী যুগের নবী-রাসূলগণের শরীয়ত যেহেতু কিয়ামত পর্যন্ত টিকিয়ে রাখা আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা নয়, সম্ভবত এ কারণেই তাঁদের মু‘জিযাগুলো তাঁদের সময়কালের সাথে সম্পৃক্ত করে অস্থায়ী মু‘জিযা প্রদান করা হয়েছে।

হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেওয়া মু‘জিযাগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মু‘জিযা হল কুরআনুল কারীম। এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিরন্তন মু‘জিযা। কেননা, তাঁর উপর অবতীর্ণ কুরআন এবং তাঁকে দেওয়া শরীয়ত কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। তাই তাঁকে এ চিরন্তন মু‘জিযা প্রদান করা হয়েছে। এর অনুরূপ কোনো গ্রন্থ বা এর কোনো অংশবিশেষের অনুরূপ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত কোনো রচনা পেশ করা কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি এবং কিয়ামত পর্যন্ত সম্ভব হবেও না।

অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালা ভালো করেই জানেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র উম্মতের একটি বিরাট অংশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অত্যন্ত সমৃদ্ধি অর্জন করবে। তারা চাঁদে যাবে। মঙ্গলগ্রহে যান পাঠাবে। তারা গতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে। তাদের যুগ হবে গতির যুগ। আর যেহেতু তিনি সর্বশেষ নবী ও রাসুল, তাঁর পর কেয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নবী বা রাসুল আগমন করবেন না। তাই কেয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সব উম্মতের ওপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণকারী একটি মোজেজা যৌক্তিকভাবেই প্রয়োজন ছিল।
তাই আল্লাহ তায়ালা তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন একটি বৈজ্ঞানিক মোজেজা দান করলেন যার মাধ্যমে তিনি তার নবীকে কেয়ামত পর্যন্ত আগত সব বিজ্ঞান, সব গতি ও আবিষ্কারকে পরাস্ত করে দিলেন। তাঁর নবীকে করলেন সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র ইসরা ও মেরাজ ছিল তেমনি একটি বৈজ্ঞানিক মোজেযা। যা চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহ বিজয়ী বিজ্ঞানীদেরকে হতভম্ব করে দেবে।

বিজ্ঞানের উৎকর্ষতায় এখন সহজেই প্রতীয়মান যে, আজ বিশ্বজুড়ে দিগন্ত জয়ের যে হিড়িক পড়েছে তার মাইলফলক এই লায়লাতুল মেরাজ। মূলত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র মিরাজ (ঊর্ধ্বারোহণ)-ই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণার দ্বার উন্মোচনের প্রথম ধাপ।

পবিত্র মেরাজ নিয়ে কিছু প্রশ্ন ও উত্তর:

আজ মুসলমানরা মহাকাশ নিয়ে এমন গবেষণা করছে যা অন্য কোন নবীর উম্মত করে নাই। যদি মিরাজের ঘটনা না ঘটতো তাহলে মহাকাশ বিজয়ের সাফল্যর একক দাবীদার হতো আজকের বিজ্ঞানীরা। আর কতিপয় ধর্মবিমুখ বিজ্ঞানী এ বিষয়ে ইসলামের উপর অপারগতা, অসম্পূর্ণতা ও অগ্রহণযোগ্যতার যুক্তি দেয়ার চেষ্ঠা করত। তাই আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবিবকে শুধু মহাকাশ নয় বরং সাত আসমান পার করিয়ে সিদ্রাতুল মুনতাহা পর্যন্ত সফর করিয়েছেন। যা বিজ্ঞানীদের নিকট শুধু স্বপ্নই থেকে যাবে।

বিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের মাথার উপর যে বায়ু স্তর রয়েছে, তার উচ্চতা মাত্র ৫২ মাইল। এর উপর আর বায়ু স্তর নেই। আছে হিলিয়াম, ক্রিপটন, জিয়ন প্রভৃতি গ্যাসীয় পদার্থ। বায়ুস্তর ভেদ করে এসব হালকা গ্যাসীয় পদার্থের অভ্যন্তরে এসে কোনো জীবজন্তুর প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব নয়। কেননা দেহের অভ্যন্তরীণ চাপ ও বহির্ভাগের চাপ সম্পূর্ণ পৃথক। এই চাপের সমতা রক্ষা করা জীবের পক্ষে কঠিন। এছাড়া ঊর্ধ্বাকাশে রয়েছে মহাজাগতিক রশ্মি ও উল্কাপাতের মতো ভয়ঙ্কর ও প্রাণহরণকারী বস্তু ও প্রাণীসমূহের ভয়।

কিভাবে আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় নবীকে আকাশের লক্ষ কোটি গ্যালাক্সি, ছায়াপথ, নিহারিকাপুঞ্জ, ধুমকেতু, ব্ল্যাক হোল ইত্যাদি পার করিয়ে উর্ধ্ব আকাশে সর্বশেষ স্থানে উপনিত করেছেন। বিজ্ঞানের জয় যাত্রার গোড়ার দিকে কোনো কোনো বৈজ্ঞানিক মেরাজের সত্যতা নিয়ে কতিপয় প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। তারা বলেছেন :

০১. Gravitational force বা মধ্যাকর্ষণ শক্তি ভেদ করে কোনো ব্যক্তির পক্ষে উপরে উঠা সম্ভব নয়।
০২. জড় জগতের নিয়ম শৃঙ্খলায় আবদ্ধ স্থূলদেহী মানুষের পক্ষে আকাশের বায়ু শুন্যস্তর ভ্রমন করা অসম্ভব কেননা মধ্যাকর্ষণ শক্তি স্থুলদেহ সম্পূর্ণ বস্তুকে নিচের দিকে আকর্ষণ করে থাকে।
০৩. বায়ুস্তর পার হওয়ার পর অক্সিজেন থাকে না আর অক্সিজেন ব্যতীত মানুষের পক্ষে বেচেঁ থাকা সম্ভব নয়।
০৪. তিনি কীভাবে অতি অল্প সময়ে এত দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আবার ফিরে এলেন? এটা অসম্ভব। ইত্যাদি।

মহান আল্লাহর ক্ষমতা, সৃষ্টির বিশালতা ও বৈচিত্র্যতা সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং বিজ্ঞান সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকার কারণে এরূপ যুক্তির অবতারণা করা হয়। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির দোহাই দিয়ে মিরাজকে অস্বীকার করার চেষ্ঠা করছে কেউ কেউ। কিন্ত আজকের বিজ্ঞানীরা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। আজ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অন্যরূপ ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তারা। তারা বলছেন,
শূন্যে অবস্থিত যে কোনো স্থূল বস্তুকে পৃথিবী যে সব সময় সমানভাবে আকর্ষণ করতে পারে না, তা আজ পরীক্ষিত সত্য। প্রত্যেক গ্রহেরই নিজস্ব আকর্ষণ শক্তি আছে। পৃথিবীরও আকর্ষণ শক্তি আছে। আবার সূর্য ও অন্যান্য গ্রহেরও আকর্ষণ শক্তি রয়েছে। সূর্য ও পৃথিবী পরস্পর পরস্পরকে টেনে রেখেছে। এ টানাটানির ফলে পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এমন একটি স্থান আছে, যেখানে কোনো আকর্ষণ ও বিকর্ষণ নেই। অতএব, পৃথিবীর কোনো বস্তু যদি এ Neutral Zone -এ পৌঁছতে পারে অথবা এ সীমানা পার হয়ে সূর্যের সীমানায় যেতে পারে, তাহলে তার আর এ পৃথিবীতে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই।

গতি বিজ্ঞান (Dynamics) বলে, পৃথিবী হতে কোনো বস্তুকে যদি প্রতি সেকেন্ডে ৬.৯৩ অর্থাৎ মোটামুটি ৭ মাইল বেগে ঊর্ধ্বালোকে ছুঁড়ে দেয়া যায়, তাহলে আর সে পৃথিবীতে ফিরে আসবে না। আবার পৃথিবী হতে কোনো বস্তু যতই উপরে উঠে যায়, ততই তার ওজন কমে যায়। ফলে অগ্রগতি ক্রমেই সহজ হয়ে যাবে।
Arther Clark বলেন, পৃথিবী হতে কোনো বস্তুর দূরত্ব যতই বাড়ে, ততই তার ওজন কমে। পৃথিবীর ১ পাউন্ড ওজনের কোনো বস্তু ১২ হাজার মাইল ঊর্ধ্বে মাত্র ১ আউন্স হয়ে যায়। এ থেকে বলা যায় যে, পৃথিবী হতে যে যত ঊর্ধ্বে গমন করবে, তার ততই অগ্রগতি সহজ হবে। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, ঘণ্টায় ২৫ হাজার মাইল বেগে ঊর্ধ্বালোকে ছুটতে পারলে পৃথিবী থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। একেই মুক্তি গতি (Escape velocity) বলে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মেরাজকালীন দুটি যানে আরোহণ করেন- মসজিদুল হারাম থেকে সিদরাতুলমুনতাহা (শেষ সীমানা) পর্যন্ত ‘ বোরাক’ এবং সিদরাতুলমুনতাহা থেকে রাব্বুল আলামীনের সান্নিধ্য পর্যন্ত রফরফ। বোরাক শব্দটি ‘বারকুন’ থেকে উদ্গত, যার অর্থ- বিজলি এবং ‘রফরফ’ অর্থ চলমান সিঁড়ি বা নরম তুলতুলে বিছানা, হাদীসে যার গতি আলোর চেয়েও বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা জানি আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। শাব্দিক অর্থ বিবেচনায় বোরাকের গতি অন্তত আলোর গতির সমান ছিল। হয়তো আরও বেশিই ছিল। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বোরাকের দ্রুতগতির বর্ণনা দিয়ে বলেছেন,’ বোরাক নিজ দৃষ্টি সীমার শেষ প্রান্তে প্রতিটি কদম ফেলে।’ ইট-কংক্রিটের শহরে মানুষের দৃষ্টি বেশিদূর যায় না ঠিকই, কিন্তু দৃষ্টির সামনে কোনো অন্তরায় না থাকলে দিগন্ত দেখা যায়। আমরা পৃথিবী থেকে আকাশও তো দেখতে পাই। সেটা প্রথম আকাশ, সপ্তম আকাশের আগে কিছু না থাকলে পৃথিবী থেকেই হয়তো সপ্তম আকাশও দেখা সম্ভব হতো।

এভাবে বিশ্লেষণ করলেই বুঝে আসে বোরাক কত দ্রুতগতির বাহন ছিল। বোরাকের গতির প্রকৃত জ্ঞান এখনো হয়তো মানুষের অর্জনই হয়নি। উপরন্তু রফরফের গতি ছিল বোরাকের চেয়ে কয়েকশত গুণ বেশি। কাজেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সপ্ত নভোমন্ডল, জান্নাত,জাহান্নাম সব দর্শন করে এসেও ওযুর পানি প্রবাহিত অবস্থায় কিংবা দরজার শিকল নড়া অবস্থায় পাওয়া এবং বিছানা উষ্ণই থাকা অদ্ভুত কিছু নয়। অর্থাৎ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিশাল ভ্রমণ তথা মেরাজ সফল সমাপ্ত হয়। অন্য বর্ণনায় পাওয়া যায়Ñ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র এই বিস্ময়কর ভ্রমণে দীর্ঘ ২৭ বছর কেটে যায়।

আলবার্ট আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি অফ টাইম তথা সময়ের আপেক্ষিকতার থিওরিটিও মিরাজের ঘটনা বুঝতে সহায়ক হয়। দ্রুতগতির একজন রকেট আরোহীর সময়জ্ঞান আর একজন স্থিতিশীল পৃথিবীবাসীর সময়জ্ঞান এক নয়। রকেট আরোহীর দুইশ বছর পৃথিবীর দুবছরের সমানও হতে পারে। পবিত্র কোরআনেও এমন একটি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। হযরত উযাইর আলাইহিস সালামকে আল্লাহতায়ালা একশ’ বছর মৃত অবস্থায় রাখলেন। তারপর তাঁকে জীবিত করে প্রশ্ন করলেন- ‘বলতো, কতদিন এভাবে ছিলে? তিনি বললেন, একদিন বা একদিনের কিছু সময় আমি এভাবে ছিলাম। আল্লাহ বললেন, না। তুমি বরং একশ’ বছর এভাবে ছিলে। তোমার খাবার ও পানিয়ের দিকে তাকিয়ে দেখ সেগুলো পচে যায়নি। আর দেখ নিজের গাধাটির দিকে। (সূরা বাকারা : ২৫৯)।
এ আয়াতে দেখা যাচ্ছে, হযরত উযাইর আলাইহিস সালাম যে সময়টাকে একদিন বা তারও কম ভাবছেন বাস্তবে তা একশ’ বছর। একদিকে তাঁর খাবার পচে যায়নি, তাতে সময়টা সামান্যই মনে হচ্ছে। অপরদিকে তার মৃত গাধার গলে-পচে যাওয়া বিচূর্ণ হাড্ডি প্রমাণ করছে, বহুকাল এরই মধ্যে চলে গেছে। এটাই রিলিটিভিটি অফ টাইম বা সময়ের আপেক্ষিকতা।

আসহাবে কাহাফের কথা চিন্তা করুন। মহান আল্লাহ্ তাদের ৩০০ বছর এক গুহার মধ্যে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলেন।

মার্কিন নভোযান ডিসকভারির মহাশূন্যচারিরা নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসায় প্রমাণিত হয়েছে, নভোভ্রমণ বাস্তবেই সম্ভব। কিন্ত হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মিরাজে গিয়েছিলেন তখন বিষয়টা কল্পনাতীত ছিল বটে।

বিজ্ঞানীদের মতে অক্সিজেন ব্যতীত মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। অথচ যে আল্লাহ সৃষ্টি জীবকে অক্সিজেনের মাধ্যমে বাঁচিয়ে রাখেন, সে আল্লাহ তায়ালা অক্সিজেন ছাড়াও বাঁচিয়ে রাখতে পারেন। যেমন হযরত ইউনূস আলাইহিস সালাম চল্লিশ দিন মাছের পেটে ছিলেন। কে তাঁকে জীবিত রেখে ছিলেন অক্সিজেন ব্যতীত?

কোনো কোনো বিজ্ঞানি বলেছেন মহাকাশের নক্ষত্রপুঞ্জের অগ্নি গোলকসমূহকে পাড়ি দেয়া কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মিরাজ কিভাবে সম্ভব?

আসলে বিজ্ঞানের যত বেশি আবিস্কার সংঘটিত হচ্ছে পবিত্র কোরআন-হাদিসের কিছু কিছু বিষয়ের মর্মার্থ বোঝা ততো সহজ হচ্ছে। কারণ বিজ্ঞান কোরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিছু নয়। বরং বিজ্ঞান পবিত্র কোরআনেরই একটি অংশ। আল্লাহ তায়ালা বলেন, বিজ্ঞানময় কোরআনের শপথ (সুরা ইয়াছিন, আয়াত : ০২)।

যদি দুনিয়ার সাধারণ একজন মানুষের পক্ষে ফায়ার প্রুফ পোশাক পরিধান করে আগুনের মাঝ দিয়ে চলা ফেরা করা সম্ভব হয় তাহলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা’র মত মহামানবের পক্ষে আল্লাহ তায়ালার বিশেষ ব্যবস্থাপনায় মহাকাশ পাড়ি দেওয়া কি করে অসম্ভব হতে পারে? আর আগুন মানুষকে পোড়ায় কিন্তু ইব্রাহীম আলাইহিস সালামকে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপের পরও তিনি পোড়া যাননি।

বিজ্ঞানের বিস্ময়কর আবিষ্কার টেলিভিশন। টেলিভিশনে স্যাটেলাইট চ্যানেলের মাধ্যমে আমরা পৃথিবীর প্রতিটি স্থানের খবর সাথে সাথে দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু এ টেলিভিশন আবিষ্কারের বহু পূর্বে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা’র সামনে আল্লাহ তাআলা হাজার হাজার মাইল দূরের সে ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাসকে উপস্থাপন করেছিলেন মুহূর্তে। নবীজি বলেন, ‘যখন কুরাইশরা মিরাজের ঘটনাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে চেষ্টা করলো, তখন আমি কাবার হাতিমে দাঁড়ালাম। এমতাবস্থায় আল্লাহ্ বায়তুল মুকাদ্দাস আমার সামনে প্রকাশ করে দিলেন। ফলে আমি বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে তাকিয়ে তার নিদর্শনগুলোর বর্ণনা তাদের দিতে লাগলাম।’ (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, মিশকাত)

পবিত্র কুরআন দ্বারা বুঝা যায় যে, ‘হযরত সুলায়মান আলাইহিস সালাম একটি যানে চড়ে সকালে এক মাসের পথ এবং সন্ধ্যা বেলায় এক মাসের পথ ভ্রমণ করতেন।’ (সূরা সাবা, ১২) হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের এ ভ্রমণ সম্ভব হলে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা’র পক্ষে বুরাক, সিঁড়ি ও রফরফের মাধ্যমে এ ভ্রমণ সম্ভব নয় কি?

আসমান থেকে পৃথিবীতে কিংবা পৃথিবী থেকে আসমানে মানুষের আসা-যাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। আমাদের প্রিয় নবীর আগেও তা’ সংঘটিত হয়েছে। হযরত আদম আলাইহিস সালাম ও তাঁর স্ত্রী হযরত হাওয়া আলাইহাস সালাম তাঁরা দু’জনেই মানুষ। সৃষ্টির পর থেকেই তাঁরা সপ্তম আসমানে অবস্থিত জান্নাতে বসবাস করছিলেন। এক পর্যায়ে আল্লাহ তাঁদেরকে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সপ্তম আকাশ থেকে পৃথিবীতে নেমে আসা চাট্টিখানি কথা নয়। এখানেও যে কুদরতী সিঁড়ির প্রয়োজন ছিলো, তা’ অবান্তর নয়। এছাড়া হযরত ঈসা আলাইহিস সালামকে ইহুদিরা হত্যা করতে চেয়েও হত্যা করতে পারেনি। আল্লাহ স্বীয় অসীম কুদরতে ঈসা আলাইহিস সালামকে সশরীরে আসমানে তুলে নিয়েছেন। (সূরা নিসার ১৫৬-১৫৮নং আয়াতে তার সাক্ষ্য রয়েছে।)

চৌদ্দশ’ বছর জ্ঞানী-বিজ্ঞানীরা যেখানে জোর গলায় প্রমাণ করে দেখাতেন যে, মহাশূন্যের মহাকাশে মানুষ বিচরণ করতে পারে না, সেখানে তারাই বিংশ শতাব্দীর শেষে প্রমাণ করে দেখালেন যে, মানুষ গ্রহ হতে গ্রহান্তরে শূন্য হতে মহাশূন্যে বিচরণ করতে পারে। নতুন আবিষ্কার করে-নতুনের সন্ধান দিয়ে তারা চৌদ্দশ’ বছরের পুরাতন বৈজ্ঞানিকদের হতাশাকে খন্ডন করতে পারেন। আমেরিকা নভোচারী ও তার সহচরবৃন্দ পৃথিবী হতে দু’ লক্ষ চল্লিশ হাজার মাইল দূরের চাঁদের সাথে মিতালি পেতে বিশ্বকে অবাক করে দিলেন। বর্তমান সময়ে বৈজ্ঞানিকদের মধ্যে চলছে দারুণ প্রতিযোগিতা। কে প্রথম মঙ্গলগ্রহে, কে বুধ, শুক্র, ইউরেনাস ও নেপচুনে গিয়ে পৌঁছতে পারবে। এরই মধ্যে পৃথিবীর সমপরিমাণ আরো সাতটি গ্রহ আবিষ্কার হয়েছে বলেও নাসার পক্ষ হতে বিশ্ববাসীকে জানানো হয়েছে।

নভোচারীদের মহাশূন্যে বিচরণের পূর্বে তাদের দেহকে তন্ন তন্ন করে অভিজ্ঞ ডাক্তার দ্বারা পরীক্ষা করা হয়। মাসের পর মাস তাদের শারীরিক সহিষ্ণুতার কৌশল, রক্তচাপ, হৃদক্রিয়া, বৃদ্ধির পরিমাণ, পঞ্চেন্দ্রিয়ের উপযুক্ততা যাচাই করে নভোভ্রমণের উপযুক্ত কিনা, তা’ বিচার করা হয়। এরপর উপযুক্তদেরকে সর্বপ্রকার ব্যবস্থাদি দিয়ে মহাকাশ বিচরণে পাঠানো হয়। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র জন্য বিংশ শতাব্দীর নভোচারীদের চেয়েও ভিন্নতর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিলো। নিশ্চয় গ্যাসীয় বস্তুর মাঝে টিকে থাকার মতো কুদরতি ঔষধ তার শরীরে প্রয়োগ করা হয়েছিলো। নবীজীকে সর্বকাজে উপযোগী ও সর্বক্ষেত্রে বিজ্ঞানীরূপে প্রকাশ করতেই আল্লাহ তাআলা হযরত জিব্রাঈল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে নবীজীর বক্ষ মুবারক অপারেশন করে তথায় শক্তিশালী নূর ও হিকমত দ্বারা আলোর স্বভাবে রূপান্তরিত করেন।

বিজ্ঞানের এসব অগ্রগতির সাথে এ কথা দিন দিন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামার এ মেরাজ সশরীরেই ছিলো। তিনি সশরীরে মেরাজে গিয়েছিলেন বললেও তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সম্ভব এবং আজকের বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা ও আগামী দিনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করতে পারছে।

পরিশেষে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনিত হতে পারি যে, পবিত্র মিরাজ অলৌকিক বটে, অযৌক্তিক নয়। মুসলমানরা আজ গর্বের সাথে বলতে পারে বৈজ্ঞানিক যত উর্ধ্বে গমন করুক না কেন, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার চেয়ে আরো অনেক অনেক গুণে উর্ধ্বে ভ্রমন করেছেন। মিরাজ মুসলমানদেরকে আল্লাহ তায়ালার আশ্চর্য সব সৃষ্টি নিয়ে ভাবতে শেখায়, গবেষণা করতে উদ্বুদ্ধ করে। এ কারণেই বর্তমানে পবিত্র মিরাজকে নিয়ে বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।

দেখুন:

মেরাজ ও বিজ্ঞান প্রসঙ্গ: মো. মাসুম বিল্লাহ বিন রেজা।
শবে মেরাজ ও আধুনিক বিজ্ঞান।
লাইলাতুল মেরাজ ও আধুনিক বিজ্ঞান: বাদশা আলমগীর।
বিশ্বনবীর মেরাজ ও আধুনিক বিজ্ঞান: এসএম আনওয়ারুল করীম।
বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মেরাজ বৈজ্ঞানিক মোজেজা : মোস্তফা।

Related Articles

Back to top button