হাজরে আসওয়াদ ও মাক্বামে ইবরাহীম দুটি জান্নাতি পাথর

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি

জুমার খুতবা

১৩ জিলক্বদ, ১৪৪২ হিজরি, শুক্রবার , ২৫ জুন, ২০২১ইং

পবিত্র কুরআনের আলোকে আল্লাহর কুদরতী নিদর্শন:

বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর ক্বিবলা বাইতুল্লাহ তথা ক্বাবা শরীফকে কেন্দ্র করে পুণ্যভূমি মক্কা মুকাররমায় রয়েছে আল্লাহর অসংখ্য কুদরতী নিদর্শন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন, “সেটার মধ্যে সুস্পষ্ট নিদর্শনাদি রয়েছে ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থান।” (সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)

বর্ণিত আয়াতের ব্যাখায় প্রখ্যাত তাফসীরকার হাকিমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নাঈমী (র.) প্রণীত তাফসীরে নূরুল ইরফানে উল্লেখ রয়েছে, এতে রয়েছে বহু বরকতময় নিদর্শন যেমন মাক্বাম-ই ইবরাহীম, হাজরে আসওয়াদ, সাফা মারওয়া, রুকনে ইয়ামানী, আরাফাত, মিনা, মুযদালাফা ইত্যাদি।

আল কুরআনে মক্বাম-ই ইবরাহীম এমন এক জান্নাতি পাথর যে পাথরের উপর দাঁড়িয়ে হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ক্বাবা শরীফ নির্মাণ করেছেন। এ পাথরে হযরত ইবরাহীম (আ.)’র গভীর পদচিহ্ন অদ্যাবধি বিদ্যমান। ইবরাহীম (আ.) ক্বাবা ঘর নির্মাণকালে ক্বাবা শরীফের দেওয়ালগুলোর উচ্চতা অনুসারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ পাথর উপরের দিকে উঠে যেতো এবং নীচে অবতরণের সময় পাথর নীচে নেমে যেতো। একটি জড় পাথরের পক্ষে প্রয়োজনানুসারে উচু নীচু হওয়া ও মোমের মত নরম হয়ে আল্লাহর নবীর পদচিহ্ন নিজের মধ্যে ধারণ করা আল্লাহর অপার কুদরতের নিদর্শন। বাইতুল্লাহ শরীফ সাতবার তাওয়াফের পর হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করে বাইতুল্লাহ শরীফ ও মাক্বামে ইবরাহীমকে সামনে রেখে দু’রাকাত নামায পড়া ওয়াজিব একে তাওয়াফের নামায বলা হয়। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “আর ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের স্থান রূপে গ্রহণকরো।” (সূরা: বাক্বারা, আয়াত:১২৫)

এ দু’রাকাত ওয়াজিব, নামাযের প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা কাফিরুন, দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইহলাস পাঠ করবে। যদি সেখানে নামাযের জায়গা পাওয়া না যায় হাতিমের ভিতর অথবা মাতাফের যেখানে জায়গা পাওয়া যাবে সেখানে উক্ত নামায পড়লে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। (আলমগীরি ১ম খন্ড)

মাক্বামে ইবরাহীম
মাক্বামে ইবরাহীম

হাদীস শরীফের আলোকে মাক্বামে ইবরাহীমের পিছনে দু’রাকাত নামায আদায় করা:

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় আগমন করে বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করেন এবং মাক্বামে ইবরাহীমের পিছনে দু’রাকাত নামায আদায় করেন এবং সাফা মারওয়ার মাঝে সাতবার সাঈ করেন। [বুখারী শরীফ, ফিকহুস সুনানি ওয়াল আছার ১ম খন্ড, পৃ: ৫০৫, কৃত: মুফতি সাইয়্যেদ আমীমুল ইহসান (র.)]

মাক্বামে ইবরাহীম

মাক্বামে ইবরাহীম ও হাজরে আসওয়াদ দু’টি জান্নাতি পাথর:

“হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি হাজরে আসওয়াদ এবং মাকামে ইবরাহীম জান্নাতের ইয়াকুত পাথর সমূহের দুটি ইয়াকুত পাথর। আল্লাহ তা’আলা এর নূরকে নিস্প্রভ করে দিয়েছেন যদি এ দুটি পাথরের নূর নিস্প্রভ না করতেন তাহলে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত আলোকিত হয়ে যেতো।” (মুসনাদে আহমদ২/২১৪, সহীহ ইবনে খুযায়মা, হাদীস নং: ২৭৩১, তারিখে মক্কা মুকাররমা, পৃ: ৬৮, তিরমিযী শরীফ, খন্ড ২, পৃ: ২৪৮, হাদীস নং: ৮৭৯, বাহারে শরীয়ত, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ: ১০৯২)

মাক্বামে ইবরাহীম পাথরটিতে নবীর কদম স্পর্শ হওয়ার কারণে সেটা মর্যাদা মন্ডিত হয়ে গেছে। মাকামে ইবরাহীমের প্রতি নামাযের মধ্যে সম্মান প্রদর্শন করা আল্লাহর নবীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নামান্তর। এ সম্মান নামাযকে ক্রটিপূর্ণ করবেনা বরং নামাযকে পরিপূর্ণই করবে। প্রতীয়মান হলো পাথর নবীর কদম স্পর্শ হওয়ার কারণে যদি সম্মানিত হয়ে যায় তাহলে নবীজির পবিত্র বিবিগণ ও সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা কত বেশী হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। (তাফসীরে নূরুল ইরফান, ১ম পারা, পৃ: ৪৬)

ক্বাবা শরীফের পূর্বদিকে সোনালী ফ্রেমে যে প্রস্তরখন্ড সংরক্ষিত আছে তাকে মাক্বামে ইবরাহীম বলে। চার হাজার বছরের অধিক সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও হযরত ইবরাহীম (আ.)’র কদম মোবারকের চিহ্ন এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে, কিয়ামত পর্যন্ত তা অপরিবর্তিত থাকবে।

হাজরে আসওয়াদ জান্নাতি পাথর:

হযরত ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথরটি) জান্নাত থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। সেটা দুধের চেয়েও অধিক সাদা ছিল, আদম সন্তানের গুনাহ সেটাকে কালো বানিয়ে দিয়েছে। (তিরমিযী শরীফ, খন্ড ২য়, পৃ: ২৪৮, হাদীস নং: ৮৭৮, বাহারে শরীয়ত: ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ: ১০৯২)

হাজরে আসওয়াদ
হাজরে আসওয়াদ

হাজরে আসওয়াদের অবস্থান:

হাজরে আসওয়াদ কালো পাথরটি বাইতুল্লাহ শরীফের দক্ষিণ পূর্ব কোণে মাতাফ (তাওয়াফের জায়গা) থেকে দেড় মিটার উপরে স্থাপিত। এটি স্বর্গীয় পাথর, এর দৈর্ঘ্য ৮ইঞ্চি ও প্রস্থ ৭ইঞ্চি, এটি ক্বাবা ঘরের দেয়ালের বাহির্দিকে প্রোথিত। হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা সুন্নাত। হাজরে আসওয়াদের কোন থেকে তাওয়াফ শুরু করতে হয়। আবার হাজরে আসওয়াদে শেষ করতে হবে। এভাবে সাতবার প্রদক্ষিণ করাকে এক তাওয়াফ বলে। ভিড় থাকলে ধাক্কাধাক্কি না করে ইশারায় চুমো দিতে হবে।

হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করা ও চুমু দেওয়া নবীজির সুন্নাত:

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) কে হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি তিনি তা স্পর্শ করেছেন ও চুম্বন করেছেন। (বুখারী শরীফ, ফিকহুস সুনানি ওয়াল আছার, ১ম খন্ড, পৃ: ৫০২)

সৈয়্যদানা আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, আমি যখন থেকে হাজরে আসওয়াদে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে চুম্বন করতে দেখেছি তখন থেকে আমি সেটাতে চুম্বন করা ত্যাগ করিনি। (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং: ১২৬৮, তারিখে মক্কা মুকাররমা, পৃ: ৬৯)

কিয়ামতের দিবসে হাজরে আসওয়াদ সাক্ষ্য দিবে:

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাজরে আসওয়াদ সম্বন্ধে এরশাদ করেছেন, আল্লাহর শপথ, আল্লাহ সেটাকে কিয়ামত দিবসে এমনভাবে উঠাবেন যে, সেটার দুটি চক্ষু থাকবে যে চক্ষুদ্বয় দিয়ে সেটা দেখতে পাবে। একটি জিহবা থাকবে যা দিয়ে কথা বলবে। চুম্বনকারীদের পক্ষে সত্য সাক্ষ্য দিবে। (তিরমিযী, ইবনে মাযাহ, দারেমী)

প্রতীয়মান হলো এ পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষ সেটাকে চুম্বন করেছে। সেটা তাদের সবাইকে জানে ও চিনে এমনকি মুমিনের অন্তরের ইহলাস ও মুনাফিকদের নিফাক সম্পর্কেও অবগত। [মিরআতুল মানাজীহ, ৪র্থ খন্ড, কৃত: হাকীমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী (র.)]

হাজরে আসওয়াদ কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে :

উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে হাজরে আসওয়াদের নিকট উপস্থিত হবে। সেটা কিয়ামতের দিন তার জন্য সুপারিশ করবে। (দুররে মনসুর, কানযুল উম্মাল, খন্ড:১২, পৃ: ৯৮, আনোয়ারুল বায়ান, খন্ড: ৩য়, পৃ: ২৮৩)

নবীজি চুম্বন করার কারণে হাজরে আসওয়াদের মর্যাদা:

আল্লাহ প্রদত্ত মর্যাদা ও সম্মানের কারণে হাজরে আসওয়াদ ও মাক্বামে ইবরাহীম আল্লাহর নির্দেশের কারণে বান্দার জন্য উপকারী। সুতরাং এতে চুম্বন করাও সওয়াবের কাজ। এটি দুআ কবুলের বরকতময় স্থান। (মিরআতুল মানাজীহ, ৪র্থ খন্ড)

হযরত আল্লামা ইমাম আহামদ কুস্তুলানী প্রণীত ইরশাদুস সারী কিতাবের ৩য় খন্ড, ১০৫৬ পৃষ্ঠায় হযরত আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী হানাফী প্রণীত ফাতহুলবারী কিতাবের ৩য় খন্ডের ৪৬২ পৃষ্ঠায় হযরত আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (র.) প্রণীত মিরকাত শরহে মিশকাত ৫ম খন্ডের ৩২৫ পৃষ্ঠায় বর্ণনা করেন, সত্বাগতভাবে কারো কল্যাণ ও সাহায্য করা এটা মহান আল্লাহর শান। আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতা ও মর্যাদার অধিকারী হয়ে আল্লাহর বান্দাদের কল্যাণ ও উপকার সাধন করার এ ক্ষমতা প্রত্যেক সম্মানিত নবী রাসূল ও আউলিয়ায়ে কেরাম দ্বারা সম্ভব ও স্বীকৃত, যা কুরআন সুন্নাহ কর্তৃক অনুমোদিত। মুমীনরাই নবী রাসূল ও অলীদের খোদা প্রদত্ত ক্ষমতায় বিশ্বাসী। মুনাফিকরাই অস্বীকারকারী। দু:খজনক হলেও সত্য যে, বিভ্রান্ত লোকেরা হাজরে আসওয়াদের ক্ষমতা স্বীকার করলেও আল্লাহর পুণ্যাত্ম প্রিয় বান্দাদের ক্ষমতাকে অস্বীকার করে।

হে আল্লাহ আমাদের সকলকে আপনার মকবুল বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত করুন। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর হিদায়ত সকলকে নসীব করুন। বৈশ্বিক করোনা মহামারির ভয়াবহতা থেকে বিশ্ববাসীকে হিফাজত করুন। আমীন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রী), বন্দর, চট্টগ্রাম,
খতীব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

Related Articles

Back to top button