সাংগঠনিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন কারণ অকারণে; একে অপরকে হিংসা করা ও নিজস্ব বলয় সৃষ্টি

কাজী মুহাম্মদ জুনাইদ জাকী

হিংসা মানে কারো সুখ-শান্তি দেখে মনে মনে জ্বলে উঠা ও তার অবসান কামনা করা। হিংসা একটি মারাত্মক রোগ। এই রোগের জন্য কোনো হাসপাতাল কিংবা ডাক্তার নেই। তাই ঔষধ/প্রতিষেধকও নেই। হিংসাকে যত বেশি মনের মধ্যে লালন করা হয় ততবেশি একে অপরের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। আর যদি সাংগঠনিক ক্ষেত্রে তথা একই সংগঠনের মধ্যে কারো সাথে হিংসা-বিদ্বেষ সৃষ্টি হয় তাহলে এটা একদিকে খারাপ বিষয় অন্যদিকে সংগঠনের জন্যও জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। বরং একে-অপরের প্রতি হিংসার কারণে সম্পর্ক নষ্ট হয়। ছড়িয়ে পড়ে নানাধরণের গীবত। কুরআন শরীফে আহলে কিতাবদের হিংসার বর্ণনা এসেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আহলে কিতাবদের মধ্যে অনেকেই হিংসা বশতঃ চায় যে, মুসলমান হওয়ার পরও তোমাদেরকে কোন রকমে কাফির বানিয়ে দেবে।”

(সূরা বাকারা, আয়াত-৪৩)।

রাসুল কারীম (দ.) এরশাদ করেন, “তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাক। কেননা হিংসা এমনভাবে পূণ্যসমূহ নষ্ট করে যেমনিভাবে আগুন লাকড়িকে গ্রাস করে ফেলে”।

সাংগঠনিক ক্ষেত্রে হিংসার কারণে সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যক্তিগত হিংসা-বিদ্বেষ যখন সাংগঠনিক পর্যায়ে চলে আসে তখন সেই সংগঠনের অবনতি অনিবার্য।
যে ব্যক্তির সাথে হিংসা থাকে সে কোনো ভালো কাজ করলেও ভালো লাগে না/ভালো চোখে দেখা হয় না। উল্টো দোষ খুঁজে বেড়াই অনেকে। নির্দিষ্ট কারো ক্ষেত্রে এমন হয় তা কিন্তু নয়। এটা আপনি-আমি, সবার ক্ষেত্রেই হয়। তাই নিজেদের মধ্যে যেকোনো হিংসা-বিদ্বেষ মনের মধ্যে না রেখে এর একটা সমাধান হয়ে গেলে সবার জন্যই ভালো। মানুষ হিসেবেও নিজেদের বন্ধন অটুট থাকবে। পাশাপাশি
সংগঠনের জন্যও ভালো হবে। কারো ভুল-ত্রুটি হয়ে গেলে ইসলাহ তথা সংশোধন করে দেয়া উচিত। অনেকের ভুলগুলো ধরে দিয়ে সংশোধন করে দেয়ার জন্য চেষ্টা করে। আবার সংশোধনের উদ্দেশ্য বললেও অনেকে সেটাকে ভিন্নভাবে মনের মধ্যে নিয়ে হিংসা কিংবা ব্যক্তিগত পর্যায়ে ক্রোধ জমিয়ে রাখে।
তাই সংশোধন করে দেয়ার ক্ষেত্রেও যাকে সংশোধন করবেন তার পরিস্থিতি ও মন-মেজাজ বুঝে এবং যেরকম-সেরকম করে/হুমকি-ধমকি দিয়ে না বলে আস্তে ধীরে কোমলতার সাথে বিষয়টা বুঝিয়ে দিলে সহজেই সুরাহা হয়ে যাবে।

অতএব, আমরা যারা প্রকৃতপক্ষে সংগঠন করি, হোক সেটা ধর্মীয়/সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক আমাদের সবারই এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত।

আরেকটা বিষয় হলো নিজস্ব বলয় করা। খেয়াল করলে দেখবেন যারা এক-আধটু কাজ করেন বিশেষত সামাজিক কিংবা ধর্মীয় সংগঠনে, (রাজনৈতিক সংগঠনে তো নেই বললেই মহা ভুল হবে) তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলয় সৃষ্টি করতে চেষ্টা করে। এর অবশ্য বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। অনেকে নিজের পরিচিতি বাড়াতে চায়, অনেকে নিজের কাজগুলোতে বাহবা পেতে চায়, অনেকে এর দ্বারা ফায়দা লুটতে চায় ইত্যাদি। সামাজিক সংগঠনের ক্ষেত্রে দেখা যায় যখনই বলয় সৃষ্টি হয়েছে বা যারা বলয় সৃষ্টি করতে চেয়েছে তখনই সংগঠনে ফাটল ধরেছে, সংগঠনের কাজ স্তিমিত হয়েছে। সামাজিক সংগঠনে বলয় সৃষ্টির কারণেই আজকাল ডজনে-ডজনে সামাজিক সংগঠন যত্র-তত্র সৃষ্টি হচ্ছে। এই সংগঠনগুলোতে দেখবেন সবাই প্রথম থেকেই ঐক্যের বাঁশি বাজায়। কিন্তু পরবর্তীতে নিজস্ব ফায়দা হাসিলের লক্ষ্যে বা ফায়দা হাসিল হয়ে গেলে সংগঠনকে খন্ড খন্ড করে দেয়। শুরুতে বিভিন্ন হৃদয়ছোঁয়া নাম দিয়ে সংগঠন হলেও বেশিরভাগই কয়েকবছরের মধ্যে নাই হয়ে যায়।

ধর্মীয় সংগঠনে আল্লাহ তায়ালা যাকে কবুল করে নেন তার মাধ্যমেই খেদমত করিয়ে নেন। খালেস নিয়তে ও সদিচ্ছায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া ধর্মীয় সংগঠনের কাজ কারো জন্যই থেমে থাকে না। তারপরও কিছুসংখ্যক সুবিধাবাদী লোকজন মসজিদ, মাদরাসা ইত্যাদি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে বলয় সৃষ্টি করলেও আল্লাহ তায়ালা এদের খুব বেশি সুযোগ দেন না। ধর্মীয় সংগঠনে বলয়/হিংসা থেকে দূরে থেকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলেই ইহকাল সুন্দর-সার্থক ও পরকালীন মুক্তি লাভ করা সম্ভব হবে। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বলয় নিয়ে কথা বলার দরকার আছে বলে মনে করি না। এই সেক্টরে যারা যুক্ত আছেন তারা বলয় বিষয়টা খুব ভালোভাবেই বুঝেন।

সারকথা হলো যেকোনো সংগঠনে অভ্যন্তরীণ লোকের মধ্যে হিংসা থাকলে কিংবা বলয় সৃষ্টির ইচ্ছা থাকলে তা সংগঠনের জন্য ক্ষতিকর। তাই সার্বিকদিক বিবেচনা করে সবধরনের সংগঠনকে হিংসামুক্ত ও বলয়মুক্ত রাখা জরুরি।

Related Articles

Back to top button
close