ইতিহাস

সাহাবায়ে কেরাম (রা:) গণের চট্টগ্রাম সফর এবং বাংলায় ইসলামের আগমন

চট্টগ্রাম বিশ্বের সু-প্রাচীন জনপদ সমূহের একটি হিসেবে ঐতিহাসিক ও ভৌগলিকভাবে প্রমাণিত ও স্বীকৃত। এটা বাংলার বাবে ইসলাম বা ইসলামের প্রবেশ দ্বার হিসাবে খ্যাত। এখানে তিন দিক দিয়ে ইসলামের আগমন ঘটে। প্রথমত: আরব বণিকগণের মাধ্যমে, দ্বিতীয়ত: দরবেশ- আউলিয়া মুজাহিদ, ধর্ম প্রচারকদের মাধ্যমে, তৃতীয়ত: বিজেতাদের মাধ্যমে।

আরব বণিকগণ আরব ছিলাে খাদ্য ঘাটতির দেশ, তাদের বাধ্য হয়ে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বাইরে যেতে হতাে। স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও নিজেই এ রকম বেশ কয়েকটি কাফেলায় শরীক ছিলেন। তৎকালীন আমদানী রপ্তানী বাণিজ্যে আরবদের জুড়ি ছিলােনা। তাদের গ্রীষ্ম ও শীতকালীন বিদেশ যাত্রার কথা কুরআনে কারীমের সূরা কুরাইশে বর্ণিত হয়েছে। আরব ভূ-খন্ড হচ্ছে একটি উপদ্বীপ। তার তিন দিকের স্থল ভাগের অধিকারী ছিল তৎকালীন দুই বৃহৎ পরাশক্তি রােম ও পারস্য, তাদের উপর দিয়ে বাণিজ্য পরিচালনা আরবদের জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বাধ্য হয়ে সামুদ্রিক পথকে বেছে নিতে হয়। উজানের পানিতে কীভাবে জাহাজ চালাতে হয় এবং জোয়ার-ভাটায় জাহাজ চালানাের পদ্ধতি বিশ্ববাসী আরবদের থেকে শিখেছেন।

 

 

আরবদের এই নৌ বাণিজ্যের সময় বঙ্গোপসাগরে চট্টগ্রাম বন্দর ছিল খুবই সুবিধাজনক পােতাশ্রয়। আরবরা এখান থেকে সুগন্ধি ও মসল্লাজাত দ্রব্যাদি আমদানি করে ইউরােপের বাজারে বিক্রি করতাে। আরবগণ যেমন তাদের বাণিজ্য জাহাজ নিয়ে সমুদ্রে চষে বেড়াতাে, ঠিক তেমনি চট্টগ্রামও তৎকালীন যুগে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য বিশ্ব জুড়ে খ্যাতি সম্পন্ন ছিলো। চট্টগ্রামের তৎকালীন যুগে নির্মিত জাহাজ অধ্যাবধি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে চট্টগ্রামের নাবিকগণও তাদের জাহাজ নিয়ে বহিঃসমুদ্রে গমন করতেন। ফলে আরবদের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে।

আরবগণ মিশনারী জাতি। যেখানে যেতেন সেখানে বসতি গড়ে তুলতন। এই ভাবে ঐতিহাসিক দলিল ও দস্তাবেজের মাধ্যমে জানা যায় যে, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগমনের পূর্বেই চট্টগ্রামে আরব বসতি গড়ে উঠে। এমনকি কর্ণফুলী নদীর নামটিও আরবদের দেয়া। আরবীতে করণফুল অর্থ লবঙ্গ। আরবদের লবঙ্গ ভর্তি একটি জাহাজ এই নদীতে নিমজ্জিত হয়েছিল বলেই এ নদীর নাম কর্ণফুলী। আদি পিতার নাজিলের স্থান আর হিন্দের প্রতি আরবদের ঝোঁক বরাবরই ছিল। অধিকন্তু তৎকালীন জাহেলী যুগের আরব কবিদের কবিতায় আল হিন্দের কথা এসেছে। কাব ইবনে যোহায়ের ইবনে আবি সালমা যিনি ছিলেন এক আরব কবি এবং পরবর্তীতে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একজন সাহাবি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে লিখতেন। পরবর্তীতে তওবা করেন এবং নিজেই ইসলাম গ্রহনের জন্য আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আসেন। যেদিন তিনি ইসলাম গ্রহন করলেন সেদিন তাঁর পাঠ করা কবিতাটি কয়েক লাইন ছিল এরকম- “আমি নিজের হাত অকপটে রেখেছি এমন এক ব্যক্তির হাতে, যার রয়েছে প্রতিশােধ গ্রহনের পূর্ণ শক্তি এবং যার কথাই কিনা সবার উপরে। আমাকে বলা হয়েছিল, তােমার নামে এরূপ নালিশ রয়েছে আর তােমাকে করা হবে জিজ্ঞাসাবাদ। অথচ নিশ্চয়ই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন এক নূর, যে নূর থেকে আলাে পাওয়া যায়। তিনি আল্লাহর তলােয়ার সমুহের মধ্যে একখানা হিন্দুস্তানি তলােয়ার।”

 

 

এই কবিতাটি আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনী আর রাহিকুল মাখতুম সহ আরও অসংখ্য জায়গায় এসেছে। সেই সময়ে হিন্দ তথা হিন্দুস্তান তথা ভারত উপমহাদেশের অনেক প্রয়ােজনীয় দ্রব্যাদি ছিল প্রশংসনীয়। হিন্দের প্রাচীন চিকিৎসা ব্যবস্থার সুনামের কথাও ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। উপরােল্লেখিত ঐতিহাসিক প্রমাণাদি হতে বুঝা যায় চট্টগ্রাম ও আরব সম্পর্ক বহু প্রাচীন।

দ্রাবিড়দেরকে এ অঞ্চলের প্রাচীন জাতি হিসেবে ধরা হয়। আর্যরা হিন্দুদেরকে তাদের আদি নিবাস কাস্পিয়ান হ্রদ এলাকা হতে এদেশে নিয়ে আসে। এক পর্যায়ে হিন্দু পূনর্জাগরণবাদীদের আশুরিক শক্তির দাপটে জৈন ধর্ম বিলুপ্ত প্রায়, বৌদ্ধদের অবস্থা তথৈবচ। ঠিক এই সময় বাংলার সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহে প্রচারিত হয়েছিল সত্য ও সাম্যের ধর্ম ইসলাম। প্রখ্যাত গবেষক গােপাল হাওলাদার বলেন, “বৌদ্ধদের উপর ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে রুষ্ট হয়ে ব্রাহ্মণদের শাস্তি দেয়ার জন্য দেবতা নিযুক্ত করলেন। আর এ দেবতা হচ্ছে মুসলমান। ড. ইবনে গােলাম সামাদের মতে ইউরােপীয় বণিকদের মধ্যে পর্তুগীজরা সর্ব প্রথম বাংলায় আসেন। তারা ১৫১৭ সালে চট্টগ্রামে ঘাঁটি গড়ে তােলেন। পর্তুগীজদের লেখা থেকে আমরা এ দেশের ইতিহাস সম্পর্কে অনেক উপাদান পাই। প্রখ্যাত পর্তুগীজ পর্যটক জোয়াওদ্য বারােজ লিখেছেন “পর্তুগীজদের চট্টগ্রামে আসার প্রায় একশত বছর পূর্বে একজন সম্ত্রান্ত আরব যুবক তার একুশ অনুচরসহ দক্ষিণ আরবের এডেন বন্দর থেকে চট্টগ্রামে আসেন। তিনি তার দীর্ঘ ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। চট্টগ্রামের মুসলমানদের মধ্যে কিছু আরব বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন, উঁচু গন্থাস্থি বক্র এক নাক এবং উপবৃহত্তকার সংকীর্ণ মুখন্ডল তাছাড়াও অনেকেই আরব উপাধি যেমন শেখ, সৈয়দ ইত্যাদি ধারণ করে। অনেক স্থানের নামের সাথেও আরবী নামের মিল পাওয়া যায়। শােলকবহর, বাকলিয়া, আলকরন ইত্যাদি, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় প্রচুর আরবী উপসর্গ বিদ্যমান। বিশেষ করে ক্রিয়া পদের পূর্বে না সূচক শব্দ ব্যবহার আরবী প্রভাবের ফল। বহুকাল আগে বহু সংখ্যক আরবী বণিক ব্যবসার উদ্দেশ্যে ভারতের মালাবা, কালিকট ইত্যাদি এলাকায় আগমনের কথা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। যেমন বর্ণিত আছে যে, মালাবায়ে চেরর রাজা চেরুমল পেরুমল সিংহাসনে আরােহণের বর্ষপূর্তিতে প্রাসাদের ছাদে উঠলে প্রত্যক্ষ করেন যে, চন্দ্র দ্বি-খন্ডিত হয়ে দুই টুকরা দুই পাহাড়ে পতিত হয়েছে। বিস্মিত রাজা পরে জানতে পারেন যে, আরবে এক নবীর উদ্ভব হয়েছে। অধিবাসিরা তাঁর মােজেজা দেখতে চাইলে তিনি চন্দ্র দ্বি-খন্ডিত করে দেখান। রাজা বিবরণ শুনে স্বয়ং আরবে গিয়ে ইসলাম গ্রহন করেন। এ সময়ে বহু সংখ্যক আরব মালাবারে গমন করেন। তারা প্রায়শই মালাবারের উপর দিয়ে চট্টগ্রাম এবং সেখান থেকে সিলেট কামরূপ হয়ে চীনের ক্যান্টন বন্দরে যাতায়াত করতেন।

 

 

সাহাবায়ে কেরামের চট্টগ্রাম আগমন

 

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় ইসলাম প্রচারের নিমিত্তে সাহাবায়ে কেরামের (রা.) একটি দল হাবশা বা আবিসিনিয়ায় পাঠিয়ে ছিলেন। তিনি হাবশার বাণিজা কেন্দ্রটিকে পূর্ণ মাত্রায় দ্বীন প্রচারে ব্যবহার করতেন। সাহাবী হযরত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) কিছু সংখ্যক হাবশী মুসলমানদের নিয়ে সম্রাট নাজ্জাশীর দেয়া একটি জাহাজে করে পূর্ব দিকে সমুদ্র পথে বের হন। তার সাথে ছিলেন সাহাবী হযরত কায়স ইবনে হুযাইফা (রা.) উরওয়া ইবনে আছাছা (রা.) আবু কায়স ইবনে হারিস (রা.) তাঁরা চীনের পথে রওয়ানা হন। হযরত আবি ওয়াককাস (রা.) হযরত আমেনার (মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মানিতা মাতা) আপন চাচাতাে ভাই। ৬২৬ খ্রিস্টাব্দ ইসলাম প্রচারকগণ চীনে অবতরণ করেন। তাদের নির্মিত কেয়াংটাং মসজিদ এবং মসজিদের অদূরেই হযরত আবি ওয়াক্কাসের কৃত্রিম কবর এখনাে চীনা মুসলামানদের জিয়ারতগার। হযরত আবি ওয়াক্কাসের এ কাফেলা হাবশা হতে চীন আসতে নয় বছর সময় নেয়। পথিমধ্যে অনেক দেশে জাহাজ নােঙ্গর করে। চট্টগ্রাম নিশ্চয় সেই তালিকা হতে বাদ পড়েনি। কারণ এটা জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপদ ট্টানজিট রুট। মুসলিম জাহান পুস্তকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাজা হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালে (৬০৬-৬৪৩ খ্রিঃ) আরব দেশ হতে একটি ছােট্ট প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার করতে আসেন। তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণে মুগ্ধ হয়ে এই অঞ্চলের অধিবাসীগণ ব্যাপকহারে ইসলাম গ্রহণ করেন। ড. কে.এন ভট্টশালী আরাকানী রাজাদের ইতিহাস গ্রন্থ ‘রাত জা তু’এ এর নিম্নরূপ একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছেন, “কানরা দজাগীর বংশীয় রাজা সত্য ইঙ্গত চন্দয়ত এর আমলে (৭৮৮-৮১০ খ্রি.) আরকান উপকূলের রণবী দ্বীপের সংগে সংঘর্ষে কয়েকটি কুল বা বিদেশী জাহাজ বিধ্বস্ত হয়। রাজা জাহাজের মুসলিম আরােহীদের উদ্ধার করে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। এ বর্ণনা থেকেও প্রতীয়মান হয় যে, যারা আরাকানে গিয়েছিলেন তাঁরা নিশ্চয় চট্টগ্রাম হয়ে গিয়েছিলেন।

১৯৮৭ সালে লালমনির হাট জেলার মসতের পাড় মৌজায় একটি টিলা খননের সময় একটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার হয়। যেখানে নির্মাণকাল উৎকীর্ণ ছিল ৬৯ হিঃ। যারা লালমনির হাটে এসেছিলেন নিশ্চয় তাঁরা বাংলার দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্র পথেই এসেছিলেন। আরবগণ দক্ষিণ চীন সাগর পাড়ি দিয়ে চীনের ক্যান্টন বন্দর, বর্তমান চট্টগ্রাম, প্রাচ্যের জাভা, সূমাত্রা প্রভৃতি বন্দরসমূহে বাণিজ্য করতেন। উপরোক্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে আল্লামা জয়নুদ্দীন তাঁর তুহফাতুল মুজাহেদীন গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে চট্টগ্রামে ইসলাম আসে। হযরত শাহ জালাল (রহ.) সিলেট বিজয়ের সময় যে বুরহানুদ্দীন ছিলেন তিনি এই আরবদেরই বংশধর। প্রখ্যাত গবেষক ড. হাসান জামান রচিত ও বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত ‘সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য’ গ্রন্থে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগে এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের কথা নির্দ্বিধায় উল্লেখ করেছেন। মাওলানা আব্দুল হাই লৌক্ষ্ণভী স্বীয় গ্রন্থ নুযহাতুল খাওয়াতের ও মাওলানা আশরাফ আলী থানবী (রহ.) সহ উপমহাদেশের নামকরা ঐতিহাসিকগণ উপরােক্ত মতের সমর্থনে অনেক তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন। চট্টগ্রামের ঐতিহাসিকদের মাঝে যারা চট্টগ্রামে সাহাবাগণের আগমণের স্বীকৃতি দেননি তাঁরা আবার ঠিক কোন সময়ে এদেশে ইসলাম এসেছে তার ব্যাপারেও সঠিক কোন ধারণা দিতে পারেননি।

 

 

١- بتاریخ بیست و پنجم ماه مبارك رمضان – سنه ثمان وسبعين وثماغاية فی عهد سلطان ركن الدنيا والدين ابو المظفر باریکشاه سلطان-

٢- ابن محمود شاه السلطان خلد الله ملکه وسلطانه . هذا المسجد مجلس أعلی عليه الرحمة والغفران بناکردلا راستخان

 

 

قال الله تعالی انما يعمر مساجد الله من امن بالله واليوم الآخر واقام الصلوة واتي الزكوة ولم يخش الا الله فعسي اولئك أن يكونوا من المهتدين – قال النبي صلى الله عليه وسلم من بنی مسجد الله بنی الله له قصرا في الجنة

في عهد السطان العادل والاحسان الموید بتائيد الديان المجاهد في سبيل الرحمن غوث الاسلام والمسلمين علاو الدني و الدين أبو المظفر حسين شاه السلطان خلد الله ملکه وسلطانه واعلى امره وشانه بناکر ده مجلس المجالس مجلس خرشید جامدار عنير محلى وزير ومصر لشکر عمرصه وتها نه چتگانوفي سنه أحدى عشرين وتسعماية

 

 

সূত্র: সোহেল মো. ফকরুদ-দীন, ‘বঙ্গদেশে মুসলমান ও পীর আউলিয়া সূফী সাধকের চট্টগ্রাম’।

সংগ্রহ করুন