নফল রোযার ফযীলত ও বিভিন্ন মাসায়েল | জুমার খুতবা | সেনানী নিউজ

অধ্যক্ষ মাওলানা মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি।

জুমার খুতবা

১১ শাওয়াল ১৪৪৩ হিজরি, শুক্রবার , ১৩ মে, ২০২২

“নফল রোযার ফযীলত ও মাসায়েল”

সম্মানিত মুসলিম ভাইয়েরা!
আল্লাহ তা’আলাকে ভয় করুন! ফরজ ইবাদত সমূহ যথাযথভাবে আদায় করুন। দৈনিক পঞ্জেগানা ফরয নামায, বৎসরে রমজানে মাসব্যাপী ফরজ রোজা পালন করুন। আর্থিক সামর্থবান হলে জীবনে একবার ফরজ হজ্ব আদায় করুন, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে সঠিকভাবে ফরজ ইবাদত হিসেবে যাকাত আদায় করুন। ফরজ ইবাদত সমূহ অপরিহার্য ও বাধ্যতামূলক। এতে অবহেলা বা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। ফরজ ইবাদত অস্বীকারকারী কাফির হিসেবে গণ্য হবে।

নফল ইবাদত দ্বারা বান্দার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়:

নফল ইবাদত বান্দার জন্য অপরিহার্য নয়। এটি ঐচ্ছিক, না করলে গুণাহ হয় না। করলে অধিক সওয়াব পাওয়া যায়, মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। আল্লাহর নৈকট্য অর্জন হয়। যেমন রাত্রিকালীন কিয়ামুল লায়ল’র নফল নামায আদায়কারী নেককার বান্দাদের প্রশংসায় আল্লাহ তা’আলা এরশাদ করেছেন “তারা রাতে অতি সামান্যই নিদ্রা যান এবং ভোর রাতে মার্জনার জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। (আল কুরআন, ২৫:৬৪)

নফল ইবাদতের ফযীলত সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা হাদীসে কুদসীতে এরশাদ করেছেন, “আমার বান্দা সর্বদা নফল ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে থাকবে। আরো এরশাদ হয়েছে, যদি সে আমার কাছে প্রার্থনা করে আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি, আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে আমি অবশ্যই তাকে আশ্রয় দেই। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৫০২)

হাদীস শরীফের আলোকে নফল রোযার ফযীলত:

রমজানের মাসব্যাপী ফরজ রোযার পর বাকী এগারো মাসে বিভিন্ন সময় বরকতময় দিন সমূহে রোযা রাখার ফযীলত সম্পর্কে অসংখ্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, এ সব রোযা নফল হিসেবে গণ্য করা হয়। নফল রোযা দ্বারা বান্দার গুণাহ মাফ হয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন হয়, ইসলামী বর্ষের দশম মাস শাওয়াল। রমজানের পরবর্তী মাস শাওয়াল মাসের ১ তারিখ পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদুল ফিতরের দিন রোযা রাখা শরয়ীভাবে হারাম। শাওয়ালের দ্বিতীয় তারিখ থেকে লাগাতার হোক বা বিরতি দিয়ে হোক শাওয়াল মাসে ছয়টি নফল রোযা রাখার ফযীলত সম্পর্কে হাদীস শরীফে বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রসিদ্ধ সাহাবী হযরত আবু আইয়ুব আনসারী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি রমজান মাসে সিয়াম পালন করল অত:পর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোযা পালন করল সে সারা বছর রোযা রাখার সওয়াব অর্জন করল।” (মুসলিম শরীফ, হাদীস :২৬৪৮)

শাওয়ালের ছয় রোযা এক বৎসরের সমান ফযীলত:

হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি ঈদুল ফিতরের পর শাওয়ালের ছয় রোযা রাখল সে পূর্ণ বছরের রোযা রাখলো। যে একটি নেক কাজ করল সে বিনিময়ে দশটি প্রতিদান পাবে। রমজান মাসের রোযা দশ মাসের সমান এবং শাওয়ালের ছয়দিনের ছয় রোজা দুই মাসের সমান, পূর্ণ এক বৎসরের রোযা হয়ে গেল। (নাসাঈ শরীফ ও ইবনে মাযাহ শরীফ, বাহারে শরীয়ত, ৫ম খন্ড, পৃ: ১৭০)

উল্লেখ্য আরবি চন্দ্র মাস হিসেবে ৩৫৪ দিন বা ৩৫৫ দিনে এক বছর হয়। এ হিসেবেও প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব দশগুণ প্রাপ্তির জন্য আরো ছয়টি রোযা রাখার প্রয়োজন হয়। তখনই ৩৬০টি পূর্ণ হয়। নবীজি স্বয়ং শাওয়াল মাসে ছয় রোযা রাখতেন সাহাবাদেরকেও তা আমল করতে উৎসাহিত করেছেন।

প্রতি চন্দ্র মাসে তের, চৌদ্দ, পনের তারিখ রোযা রাখা সুন্নাত:

আয়্যামে বীযের রোযা রাখা সুন্নাত। বীজ অর্থ সাদা বা উজ্বলতা, যে দিন গুলোতে রাতের বেলায় আকাশ সাদা থাকে, এ কারণে আয়্যামে বীজ বলা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি মাসে আয়্যামে বীযের রোযা রাখতেন। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তের, চৌদ্দ, পনের তারিখে রোযা পালনের নির্দেশ দিয়েছেন, রাবী বলেন, নবীজি এরশাদ করেছেন, আয়্যামে বীযের রোযা সারা বছর রোযা রাখার সমতুল্য।” (আবু দাউদ শরীফ, হাদীস: ১৪৪৯)

হযরত দাউদ (আ:) একদিন রোযা রাখতেন একদিন বিরতি দিতেন:

হযরত আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন আস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেছেন, আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় নামায হলো দাউদ (আ:)’র নামায। আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় রোযা হলো দাউদ আলাইহিস সালাম’র রোযা। তিনি অর্ধরাত পর্যন্ত নিদ্রা যেতেন এক তৃতীয়াংশ তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করতেন, রাতের এক ষষ্ঠাংশ নিন্দ্রা যেতেন একদিন রোযা পালন করতেন, একদিন রোযা বিহীন থাকতেন। (বুখারী শরীফ, হাদীস :১১৩১)

ইহকালীন ও পরকালীন হাজত পূর্নতার জন্য সপ্তাহে তিনদিন নফল রোযা:

প্রতি সপ্তাহে তিনদিন বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রবার রোযা পালন দ্বারা আল্লাহ বান্দার ইহকালীন ও পরকালীন মকসুদ পূর্ণ করেন। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, হযরত আনাস ইবন মালিক রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যদি আল্লাহর নিকট কোন ব্যক্তির ইহকালীন পরকালীন হাজত থাকে সে যেন প্রথমে সাদকা করে, অতঃপর বুধবার, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সিয়াম পালন করে। অতঃপর জামে মসজিদে গমন করত: বারো রাকাআত নামায আদায় করবে। প্রথম দশ রাকাতে সূরা ফাতিহা একবার এবং আয়াতুল কুরসী দশবার পাঠ করবে। প্রত্যেক শেষ রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা ইখলাস পঞ্চাশ বার পাঠ করবে। অতঃপর যা ইচ্ছা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবে। আল্লাহ তা’আলা তার ইহকালীন পরকালীন মকসূদ পূর্ণ করবেন। হাদীসটি ইবনে জাওযী (র.) ইব্বন ইব্‌ন আইয়্যাশ (র.)’র সূত্রে বর্ণনা করেছেন। [হাদীস নং: ৬৮৮১, সহীহুল বিহারী, খন্ড:০৬, কৃত মালিকুল ওলামা যুফরুদ্দীন বিহারী (রহ.)]

মহররম মাসে নবম ও দশম তারিখ রোযা পালন করা নফল:

মহররম মাসের রোযার ফযীলত সম্পর্কে হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে, রমজানের সিয়ামের পর সর্বোত্তম সিয়াম হচ্ছে, আল্লাহর মাস মহররমের রোযা এবং ফরজ নামাযের পর সর্বোত্তম নামায হচ্ছে, রাতের নামায (তাহাজ্জুদের নামায)। (মুসলিম শরীফ, হাদীস ২৬৪৫, আবু দাউদ শরীফ, হাদীস ২৪২৯)

হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন তোমরা মহররম মাসের নবম ও দশম তারিখে রোযা পালন করো এবং ইয়াহুদীদের বিপরীত করো। (তিরমিযী শরীফ, ১ম খন্ড, হাদীস : ৭৫৫)

সোমবার দিবসে রোযা পালন করা:

সোমবার দিবসে রোযা রাখার গুরুত্ব হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। হযরত কাতাদাহ্‌ রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সোমবার দিবসে রোযার কারণ জিজ্ঞেস করলে তদুত্তরে নবীজি এরশাদ করেছেন, এ দিনেই আমি জন্ম গ্রহণ করেছি, এদিনে নবুয়ত পেয়েছি, এ দিনে আমার উপর কুরআন মজীদ অবতীর্ণ হয়েছে। ( সহীহ মুসলিম শরিফ: ২/৮১৯)

শরয়ী মাসায়েল:

মহিলারা স্বামীর অনুমতি ছাড়া নফল রোজা রাখা জায়েজ নয়। সারা বৎসর রোযা রাখা ও সওমে বেসাল তথা সেহেরী ইফতারী বিহীন রোযা রাখা মাকরুহ। [মালাবুদ্দা মিনহু, কৃত: কাযী ছানা উল্লাহ পানিপথী (র.)]

মাসয়ালা:
নফল রোযা শুরু করার দ্বারা আবশ্যক হয়ে যায়। যদি ভঙ্গ করে, কাযা করা ওয়াজিব। (বাহারে শরীয়ত, ৫ম খন্ড, পৃ: ১৬৬)

মাসয়ালা:
নফল রোযা বিনা ওজরে ভেঙে ফেলা জায়েজ নয়। তবে ওজরের কারণে কাযা রাখার শর্তে ভেঙ্গে ফেলা যাবে। আরো শর্ত হলো দ্বিপ্রহরের পূর্বে ভঙ্গ করা যাবে, পরে নয়। (আলমগীরি, দুররুল মোখতার, রদ্দুল মোহতার, বাহারে শরীয়ত ৫ম খন্ড, পৃ: ১৬৬)

হে আল্লাহ! আমাদেরকে নফল নামায, নফল রোযা পালন করার মাধ্যমে আপনার সন্তুষ্টি অর্জন করার তাওফিক নসীব করুন। আমীন।

লেখক : অধ্যক্ষ, মাদরাসা-এ তৈয়্যবিয়া ইসলামিয়া সুন্নিয়া ফাযিল (ডিগ্রি);
খতিব, কদম মোবারক শাহী জামে মসজিদ।

Related Articles

Back to top button