প্রবন্ধ

সৎ কাজের আদেশে যে পাঁচটি বিষয় প্রয়ােজন

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করার জন্য পাঁচটি বিষয় আবশ্যক।

এক| ইলম তথা জ্ঞান। কেননা দ্বীনি ইলম না থাকলে অজ্ঞ ব্যক্তি ভালভাবে সৎকাজের আদেশ দিতে সক্ষম হবেনা। বরং এতে হিতে বিপরীত হবে।

দুই| উদ্দেশ্য থাকতে হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীন রক্ষা। হযরত ইকরামা (রা.) বর্ণনা করেন, এক ব্যক্তি পথ চলতে চলতে দেখল যে, একদল মানুষ আল্লাহকে বাদ দিয়ে একটি গাছের পূজা করছে। সে খুব ক্রুদ্ধ হলাে এবং মনে মনে বললাে, আল্লাহকে বাদ দিয়ে এই গাছটির পূজা করা হচ্ছে? সে একখানা কুড়াল নিয়ে নিজ গাধায় চড়ে ঐ গাছটির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাে। তার ইচ্ছে গাছটি কেটে ফেলা। পথে তার সাথে অভিশপ্ত ইবলীসের সাক্ষাত হলাে। ইবলীস ছিল মানুষের আকৃতিতে। সে প্রশ্ন করলাে কোথায় যাচ্ছ? সে বলল, দেখলাম যে, মানুষ আল্লাহকে বাদ দিয়ে একটি গাছের পূজা করছে। তাই আমি আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছি যে, আমি আমার গাধায় চড়ে কুড়াল নিয়ে ঐ গাছের নিকট যাবাে এবং ওটাকে কেটে ফেলবাে। ইবলীস বলল, ঐ গাছের সাথে তােমার কি সম্পর্ক? তুমি ঐ গাছ এবং যে সব হতভাগারা সেটির পূজা করছে, তাদের ব্যাপারটি ত্যাগ কর। এ বিষয়ে ইবলীস ও লােকটির মধ্যে তর্ক হলাে এবং এক পর্যায়ে তারা মল্ল যুদ্ধে লিপ্ত হলাে।তিনবার ইবলীস পরাজিত হলাে। ইবলীস যখন আর পারছিল না আবার নিজের বক্তব্য পরিহার করছিল না, তখন বলল, তুমি ফিরে যাও। আমি তােমাকে প্রতিদিন চারটি করে দিরহাম দেবাে। তুমি প্রতিদিন তােমার বিছানার একপ্রান্ত তুলে তা নিয়ে নিও। লােকটি বলল, তুমি কি তা করবে? ইবলীস বলল, হ্যা। লােকটি বাড়ি ফিরে এলাে। দু’তিন দিন যাবৎ সে এরূপ পেতে লাগলাে। পরে একদিন সে বিছানা তুলে দেখল দিরহাম পাওয়া যাচ্ছেনা। তখন সে কুড়াল নিয়ে গাধায় চড়ে রওয়ানা হলাে। পথিমধ্যে মানুষের আকৃতিতে ইবলীসের সাথে তার সাক্ষাত হলাে। প্রশ্ন করলাে কোথায় যাচ্ছ? বলল, আল্লাহকে বাদ দিয়ে একটি গাছের পূজা করা হচ্ছে, আমি সেটিকে কাটতে চাই। ইবলীস বলল, তুমি তা পারবে না প্রথমবার তুমি বের হয়েছিলে আল্লাহর উদ্দেশ্যে ক্রোধ নিয়ে। তাই আসমান জমিনের সবাই একত্রিত হলেও তােমাকে বাধা দিতে পারত না। কিন্তু এখন তুমি বের হয়েছ নিজের গরযে টাকা না পাওয়ার কারণে। এখন আমি যদি এগিয়ে আসি তােমার ঘাড় মটকে দিতে পারি। এ কথা শুনে লােকটি ঘরে ফিরে গেল।(তান্বীহুল গাফেলিন)

তিন| যাকে আদেশ-নিষেধ করবে তার প্রতি স্নেহ-মমতা থাকতে হবে। রুক্ষ বা কঠোর ভাষায় আদেশ-নিষেধ করবেনা। আল্লাহ তায়ালা যখন হযরত মুসা ও হারুন (আ.)’কে ফেরাউনের উদ্দেশ্যে পাঠাচ্ছিলেন, তখন তাদেরকে বলে দিয়েছিলেন- فقولا له قولا لينا “তােমরা তাকে নরম ভাষায় কথা বলবে।”

চার| ধৈর্য-সহ্য থাকতে হবে। হযরত লােকমান (আ.)’র ঘটনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-وأمر بالمعروف وانه عن المنكر واصبر على ما أصابك “তুমি সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে এবং তােমার উপর কোন মুসীবত আসলে তাতে ধৈর্য ধারণ করবে।(সূরা লোকমান,আয়াত;১৭)

পাঁচ| অন্যকে যে বিষয়ে আদেশ করা হবে তা নিজে আমল করতে হবে। না হয় অন্যরা তাকে লজ্জা দেবে এবং সে আল্লাহর এই আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হবে, أتامرون الناس بالبر وتنسون أنفسكم “তােমরা কি লােকদেরকে সৎকাজের আদেশ করছ অথচ নিজেদের কথা ভুলে যাচ্ছ? (তান্বীহুল গাফেলিন)

হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন –

عن رسول الله صلى الله عليه سلم قال: ” رأيت ليلة أسري بي رجالا تقرص شفاههم بمقاريض من النار فقلت: منْ هؤلاء يا جبريل؟، فقال: هؤلاء خطباء أمتك يامرون الناس بالبر وينسون انفسهم وفي روايته قال خطباء من أمتك الذين يقولون ما لا يفعلون، ويقرؤن كتاب الله ولا يعملون-

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, মি’রাজের রাতে আমি বহু লােককে দেখেছি যে, তাদের ঠোঁট আগুনের কাঁচি দ্বারা কাটা হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিব্রাইল! এরা কারা? তিনি বললেন, এরা আপনার উম্মতগণের মধ্যে বক্তাগণ, যারা লােকদেরকে ভালকাজের আদেশ করত কিন্তু নিজেদেরকে ভুলে যেতাে অর্থাৎ নিজেরা সৎকাজ করতােনা।”

বায়হাকীর অপর বর্ণনায় আছে- জিবরাইল বলেছেন, এরা আপনার উম্মতের সেসব খতীব বা বক্তাগণ, যারা এমন সব কথা বলতাে যা তারা নিজেরা আমল করতাে না, তারা আল্লাহ তায়ালার কুরআন তিলাওয়াত করতাে কিন্তু সে মতে আমল করতােনা।
(শরহে সুন্নাহ ও বায়হাকি)

হযরত উসামা বিন যায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন-
قال رسول الله صلى الله عليه وسلمّ،” يجاء بالرجل يوم القيامة فيلفى في النار، فتندلق أقتابه في النار، فيدور كما يدور الحمار برحاه، فيجتمع أهل النار عليه قيقولون: أي فلان ما شأنك؟ أليس كنت تأمرنا بالمعروف وتنهانا عن المنكر؟ قال: كنت آمركم بالمعروف ولاً آتيه، وأنهاكم عن المنكر واتيه-

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, কিয়ামতের দিন একদল লােককে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। সাথে সাথেই তার পেট থেকে নাড়িভুড়ি বের হয়ে পড়বে। সে নাড়িভুঁড়িকে কেন্দ্র করে সেটার চতুদিকে এমনভাবে ঘুরতে থাকবে, যেভাবে গাধা আটার চক্কিকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে। এটা দেখে দোযখবাসীরা তার পাশে একত্রিত হয়ে বলবে, হে অমুক! তােমার একি অবস্থা? তুমি না আমাদেরকে ভাল কাজের আদেশ করতে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতে? লােকটি বলবে, আমি তােমাদেরকে ভালকাজের জন্য আদেশ করতাম, কি্তু নিজে সেটা করতাম না, আর তােমাদেরকে মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতাম, কিন্তু নিজে সেটা থেকে বিরত থাকতাম না। (বুখারী ও মুসলিম)