জীবনী

যুগশ্রেষ্ঠ রাহবার শেরে মিল্লাত মুফতি ওবায়দুল হক নঈমী (রহ.)

ইহকালীন তিরোধানের পরেও যেসব মহামানবগণ  দুনিয়ায় কর্মগুণে অমরত্ব লাভ করেছেন, মানবজাতির হৃদয়ের মাঝে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন সেসব মহিমান্বিত বীরপুরুষদের মাঝে শেরে মিল্লাত মুফতি মাওলানা মুহাম্মদ ওবাইদুল হক নঈমী রহ. ছিলেন অন্যতম। তিনি ছিলেন যুগের অপার এক বিস্ময়কর প্রতিভার দৃষ্টান্ত। তিনি একাধারে উপমহাদেশের যুগশ্রেষ্ঠ মুফতিয়ে জামান, শায়খুল হাদীস, বাগ্মী, মুনাজির (তার্কযোদ্ধা) এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মতাদর্শ প্রতিষ্ঠায় অকুতোভয় সৈনিক ছিলেন।

জন্ম ও পরিচয়ঃ

“মদিনাতুল আউলিয়া” খ্যাত চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার চাঁপাতলী গ্রামে ১৯৪৩সালের মার্চ মাসে নুর আহমদ মুন্সী আল-কাদেরী রহ. ও ছাফুরা খাতুনের ঔরষে জন্মগ্রহণ করেন। শেরে মিল্লাত রাহ’র পূর্বপুরুষ ছিলেন হযরত শাহ আছাদ আলী ফকির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। তাঁর মাধ্যমে অসংখ্য লোক ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন। হুযুরের শ্রদ্ধেয় পিতা নুর আহমদ মুন্সী রহ. গাজীয়ে দ্বীনে মিল্লাত ইমাম শেরে বাংলা রাহ. এর খুবই ভক্ত ছিলেন। শেরে মিল্লাত যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন তখন পিতা নুর আহমদ মুন্সী ইমাম শেরে বাংলা রাহ. কে মেহমানদারির জন্য দাওয়াত দিলে ইমাম শেরে বাংলা রাহ. উনার পিতা-মাতার উদ্দেশ্যে  বললেন, “আমার নাম আজিজুল হক মানে তথা আল্লাহর অতীব প্রিয়জন। আর তোমাদের সন্তানের নাম হচ্ছে ” ওবাইদুুল হক” তথা আল্লাহর অতীব প্রিয় বান্দা।”

শিক্ষা ও বাল্যকালঃ

ছোটবেলায় তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতার তত্ত্বাবধানে স্হানীয় মক্তবে ছয় বছর বয়সে পবিত্র কুরআন শরীফ শেষ করেন। অতঃপর তিনি চট্টগ্রামের প্রাচীনতম দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাঁচলাইশ ওয়াজেদিয়া আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সাথে দাখিল, আলিম ও ফাযিল উত্তীর্ণ হন। তিনি তৎকালীন প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন আল্লামা মুফতি আতিকুল্লাহ খান রহ. ও আল্লামা মুফতি মুসা মুজাদ্দেদী রহ.’র সান্নিধ্যে থেকে তাফসীরুল কুরআন, হাদীস, ফিকহ, উসুল ফিকহ, ইলমুল কালাম, ইলমুন্নাহু, যুক্তিবিদ্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। এরপরও এই তালেবে ইলমের জ্ঞানার্জনের তৃষ্ণা মিটেনি।
তিনি ১৯৬২ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের গুজরাটস্হ প্রসিদ্ধ দ্বীনি মারকাজ জামেয়া নঈমীয়ায় গমন করেন। সেখানে তিনি যুগশ্রেষ্ঠ আলিম হাকিমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী বাদায়ুনী আশরাফী রাহ. এর সান্নিধ্যে লাভে ধন্য হন। তিনি গুজরাট থেকে ফিরে এসে ইলমে দ্বীন হাসিলের উদ্দেশ্যে ১৯৬৪সালে পুনরায় গুজরাট গমন করেন।

১৯৬৫ সালে এদেশে প্রত্যাবর্তন করে ওয়াজেদীয়া আলিয়া মাদরাসা থেকে কামিল হাদীস বিভাগে অধ্যয়ন করে ইলমে হাদীস বিষয়ে গভীর জ্ঞানার্জন করে “মুমতাজুল মুহাদ্দিসীন” সনদ লাভ করেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের প্রসিদ্ধ কলিকাতা আলিয়া মাদরাসা ঢাকাতে স্থানান্তরিত হলে সেখানে ইসলামী আইন অনুষদে ভর্তি হন। এখানে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদীর জ্ঞানার্জন করেছিলেন। মাদরাসা-এ আলিয়া ঢাকাতে বিশ্ববিখ্যাত আলেমে দ্বীন আল্লামা মুফতি আমিমুল ইহসান মুজাদ্দেদী বারকাতী রহ. এবং আরব্য পন্ডিত আল্লামা আবদুর রহমান কাশগরী রহ. এর মতো পন্ডিতদের কাছ থেকে ইলমেদ্বীন হাসিল করে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। শুধু শিক্ষাজীবনে নয়, তিনি সারাজীবনই এরুপ ইলমে দ্বীনে জ্ঞান পিপাসু ছিলেন। ইলমে দ্বীনের এই তৃষ্ণা যেন রাসুলে কারীম দ. -এর অমীয় বাণী- “দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন করো ” -এই হাদিসে মোবারাকার প্রাকটিকাল দৃষ্টান্ত।

কর্মজীবনঃ

শেরে মিল্লাত মুফতি ওবায়দুল হক নঈমী রহ. তাঁর স্মৃতি বিজড়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ওয়াজেদীয়া আলিয়া মাদরাসাতে ১৯৬৬সালে সর্বপ্রথম শিক্ষকতা পেশায় যোগদানের মাধ্যমে ইলমে দ্বীনের দরস প্রদান শুরু করেন। সেখানে এক বছর শিক্ষাদানের পর ১৯৬৭সালে হাটহাজারী অদুদিয়া সুন্নিয়া মাদরাসায়ও এক বছর শিক্ষকতা করেন।  পরেরবছর এশিয়াখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদরাসায় মুহাদ্দিস পদে যোগদান করে সুদীর্ঘ ১১বছর (১৯৬৮-১৯৭৯) ইলমে হাদীসের দরস প্রদান করেন। ১৯৮০সালে পটিয়াস্হ শাহচাঁন্দ আউলিয়া আলিয়া মাদরাসায় একবছর মুহাদ্দিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর পুনরায় জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়াতে শায়খুল হাদীস পদে যোগদান করে সুদীর্ঘ ১৯৮০-২০২০ তথা মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত হাদিস, তাফসীর ও ফিকহের দ্বীনি খেদমত করে যান যা বিরল। তিনি আওলাদে রাসুলের সাজানো বাগান কিশতীয়ে নূহ খ্যাত জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়াতে মোট ৫০বছর ধরে খেদমত করে গেছেন। তাঁর শিক্ষকতাজীবন ছিলো কৃতিত্বপূর্ণ। তিনি ছাত্র-শিক্ষক, মাদরাসা পরিচালনা পরিষদসহ সকলের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর জ্ঞানের পরিধি, গভীরতা ও অসাধারণ পাঠদানের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এককথায় শেরে মিল্লাত মুফতি ওবায়দুল হক নঈমী রহ.  ছাত্র হিসেবে যেমন মেধাবী ছিলেন, শিক্ষক হিসেবেও ছিলেন অনন্য দক্ষ ও প্রজ্ঞাবান।

সাংগঠনিক ক্ষেত্রে শেরে মিল্লাত (রহঃ):

সাংগঠনিক ক্ষেত্রে শেরে মিল্লাত রহ. সবসময় মূলধারার সাথে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মতাদর্শ ভিত্তিক প্রতিষ্ঠিত ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রসেনার প্রতিষ্ঠাতা পৃষ্ঠপোষক এবং রাজনৈতিকভাবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মতবাদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য গঠিত সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামি ফ্রন্টের প্রেসিডিয়াম সদস্য এর গুরুদায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি ওয়ার্ল্ড ইসলামিক মিশন (লন্ডন) -এর সদস্য, আহলে সুন্নাত সম্মেলন সংস্থা (ওএসি) -এর উপদেষ্টা এবং আলা হযরত ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের উপদেষ্টা পদে দায়িত্ব পালন করে নিজেকে সর্বদা সুন্নীয়তের খেদমত নিয়োজিত রেখেছিলেন।

পীর ও মুর্শিদের দরবারে খেদমতঃ

তিনি ১৯৬৮সালে আওলাদে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), মুর্শিদে বরহক আল্লামা হাফেজ ক্বারী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়ব শাহ রাহমাতুল্লাহি আলাইহির পবিত্র হাতে বায়আত গ্রহণ করে ইন্তেকাল আগ পর্যন্ত দরবারে আলিয়া কাদেরীয়া সিরিকোট শরীফের মুর্শিদে কারীম এবং শাহজাদাগণের খেদমত ও ওয়াফাদারী করে গেছেন যা এককথায় বিরল।

রচনাবলীঃ

শেরে মিল্লাত রহ. তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনে শিক্ষকতা, ওয়াজ-নসীহত, সাংগঠনিক খেদমতের পাশাপাশি দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থও লিখে গেছেন। প্রথমটি হলো মিলাদ-ক্বিয়াম সংক্রান্ত “দালায়েলুল ক্বিয়াম লি মিলাদে খাইরিল আনাম”। অপরটি হলো ইমাম মুহাম্মদ রহ. এর মুয়াত্তা গ্রন্থের ব্যাখ্যা “কাশিফুল মুগাম্মাদ শরহে মু’আত্তা ইমাম মুহাম্মদ”।

ইন্তেকালঃ

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের এই যুগশ্রেষ্ঠ রাহবার ১৪৪১ হিজরীর ১৪ই জিলক্বদ, ২০২০ সালের ৬ই জুলাই রোজ সোমবার হাজার-হাজার ভক্ত, শিক্ষার্থী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের ছেড়ে মহান রাব্বুল আলামীনের ডাকে ইহকাল ত্যাগ করেন। তাঁর ইন্তেকালে দরবারে আলিয়া কাদেরীয়া সিরিকোট শরীফের সাজ্জাদানশীন আওলাদে রাসুল দ. গাউছে জামান আল্লাম সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ মু.জি.আ. বলেছেন, “নঈমী সাব পর মাশায়েখে হযরত খোশ হ্যাঁয়” অর্থাৎ নঈমী সাহেবের  প্রতি তাঁর দরবারে আলিয়া কাদেরীয়া সিরিকোট শরীফের সকল মাশায়েখে তরীকত সন্তুষ্ট আছেন। বস্তুত এটা নেহায়াতই  সিরিকোট শরীফ থেকে স্বীয় দরবারের প্রতি খেদমত আনজাম দেয়ার ফসল।

আল্লাহ তায়ালা উনাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের আলা মকাম দান করুক। আমাদের সবাইকে যুগশ্রেষ্ঠ এই আলেমেদ্বীনের ফয়ুজাত-বারাকাত দান করুক। আমিন, বিহুরমতি সায়্যিদিল মুরসালিন।